মূল্যস্ফীতিই চ্যালেঞ্জ আগামী বাজেটে

রাশেদ হোসাইন

বহুমুখী চাপে পড়বে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি ও বিনিয়োগে স্থবিরতা। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। জনজীবনে সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ছে। ফলে ব্যবসায় মুনাফা কমছে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা কমছে।

অর্থনীতিবিদরা জানান, অর্থনীতিতে প্রথম ধাক্কাটি আসে মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে। বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, যা ধাপে ধাপে খাদ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ায়। বাংলাদেশ প্রায় তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে, যা কখনো কখনো দুই অঙ্কও ছুঁয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এনবিআরের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) শুল্ককর আদায়ে ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এ সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্যসংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। ফলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে বাড়তি চাপ কাজ করবে। বাজেট নিয়ে বেসরকারি গবেষণা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলা হয়, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট এমন এক সময়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে কম রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমানে সরকার চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

যেখানে আসন্ন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার বহুমুখী চাপের সম্মুখীন। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে সুদের হার এখনো দুই অঙ্কের ঘরে থাকায় এবং ঋণের প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিনিয়োগ পরিস্থিতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বিশাল রাজস্ব ঘাটতি। এখন পর্যন্ত ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল ঘাটতি মেটানো এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও সুদের হারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা। সামগ্রিকভাবে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, রাজস্ব সংকট এবং বিনিয়োগ মন্দার এক কঠিন সমীকরণ সামনে রেখেই এবারের বাজেট পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, আগামী বাজেটে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি। সরকার যখন ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয় তখন ইনফ্লেশন বেড়ে যায়। অর্থনীতির ভাষায় বলে লিকুইডিটি ট্র্যাপ। সরকার এখন যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে সবগুলো ব্যয়ভিত্তিক। জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্যমূল্য বেড়ে গেছে। হাওড়ে ধানগুলো নষ্ট হওয়ায় চালের জোগানের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির এই সমন্বয় অর্থনীতিকে একটি ‘স্থবির অর্থনীতি’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা কর্মসংস্থান সংকুচিত করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights