যমুনার ভাঙনে তিন মাসে দুই হাজার বিঘা জমি বিলীন, নিঃস্ব হাজার পরিবার
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত তিন মাসে নদীভাঙনে শাহজাদপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার চরাঞ্চলে শত শত বিঘা ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা ও কবরস্থান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শুধু শাহজাদপুরের সোনাতনী ইউনিয়নেই দুই শতাধিক বাড়িঘর এবং প্রায় দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি হারিয়েছেন স্থানীয়রা। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
ভাঙনকবলিত মানুষের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হলেও পুনর্বাসনের উদ্যোগ না থাকায় হতাশা বাড়ছে। অনেকে পলিথিনের ছাউনি কিংবা জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একই সঙ্গে গাছপালা বিলীন হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি ও বারপাখিয়া এবং গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও হাতকোড়া এলাকায় যমুনার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত তিন মাসে কুরসি ও ধীতপুর গ্রামে দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সম্প্রতি ভাঙনরোধে বালুর বস্তা ফেলার দাবিতে কুরসি বাজার এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন এলাকাবাসী।
ভাঙনে ধীতপুর-কুরসি গরুর হাট ও বাজারও নদীগর্ভে চলে গেছে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং গরু-ছাগল কেনাবেচায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ পর্যন্ত দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ-মাদ্রাসা, একটি অফিসঘর, দুই শতাধিক বাড়িঘর, প্রায় দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীতে বিলীন হয়েছে।
3
ধীতপুর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা আন্না খাতুন জানান, এক শিশুকন্যাকে নিয়ে গত এক বছর ধরে বাবা-মায়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। যমুনার ভাঙনে সেই বাড়িও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন পরিত্যক্ত একটি জরাজীর্ণ ঘরে মা ও শিশুকন্যাকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। ঘরের এক পাশ মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘেরা। অন্য পাশের পাটকাঠির বেড়া পচে ভেঙে পড়ছে এবং চালও নুইয়ে গেছে। সরকারি সহায়তার ১০ কেজি চালেই কোনো রকমে তাঁদের দিন চলছে।
কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, ‘যমুনার ভাঙনে আমার আট বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে ভুট্টা, ধান, সরিষা, বেগুন, টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে স্বচ্ছল জীবনযাপন করতাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’
ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন বলেন, ‘ভাঙনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় শূন্য ভিটায় খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে আছি। বৃষ্টি এলে সবকিছু ভিজে যায়।’
শামছুল হক বলেন, ‘যমুনায় বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় পাশের শ্রীপুর গ্রামে অন্যের জমি বছরে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি।’
চরাঞ্চলের বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মণ্ডল বলেন, ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত বালুভর্তি জিওটিউব ফেলা জরুরি। তাঁদের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড চরবাসীদের বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ায় ভাঙনরোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
শুধু শাহজাদপুর নয়, চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ এবং কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া ও চরগিরিস এলাকাতেও ব্যাপক ভাঙন চলছে। এসব এলাকায় ফসলি জমি ও বসতভিটা বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন বলেন, ‘ভাঙন এলাকা পরিদর্শনের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চরাঞ্চলের ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারি কোনো প্রকল্প বা বরাদ্দ নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকলে সেগুলো রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড মূলত নদীর তীর রক্ষায় কাজ করে। নদীর ডান বা বাম তীরে সমস্যা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
