যুদ্ধ-জ্বালানি সংকটের মাঝেও ব্রিটিশ অর্থনীতিতে চমক, নেপথ্যে এআই

অনলাইন ডেস্ক

প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউড কম্পিউটিং-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে জুলাইয়ে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। অথচ অর্থনীতিবিদেরা এ সময়ে কোনও প্রবৃদ্ধি হবে না বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জুনে ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর জুলাইয়ে জিডিপি আরও ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। শহরের অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল, জুলাইয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শূন্যে থাকবে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং বছরের শুরুতে প্রত্যাশার তুলনায় সুদের হার বেশি থাকার কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হলেও সর্বশেষ পরিসংখ্যান অর্থনীতির আপাত স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে ভর করে সেবা খাত
ওএনএস জানিয়েছে, জুলাইয়ের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল সেবা খাত। এ খাতে ০.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রশাসনিক সেবা, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এবং পরামর্শক খাত বিশেষভাবে ভালো করেছে।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও পরামর্শক খাতের বিষয়ে ওএনএস জানিয়েছে, জুলাইয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বা ব্যবসায়িক আয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তাদের অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিং-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে যুক্ত।

ডব্লিউপিআই স্ট্র্যাটেজির প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্টিন বেক বলেন, অর্থনীতির অনেক ঐতিহ্যবাহী খাত যখন এখনও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, তখন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম এমন বিনিয়োগ যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

পিডব্লিউসির প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্যারেট কুপেলিয়ানও এআইয়ের প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। পেশাদারি সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক সেবার মতো এআই-নির্ভর খাতগুলোতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

শিল্প উৎপাদনেও প্রবৃদ্ধি
শুধু সেবা খাত নয়, জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যের শিল্প উৎপাদনও বেড়েছে। ওএনএসের হিসাবে, শিল্প উৎপাদন ০.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

উৎপাদন খাতের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে খনিজ উত্তোলন এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ খাতে কমে যাওয়া উৎপাদনের প্রভাব অনেকটাই পুষিয়ে গেছে।

অর্থনীতির প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে তিন মাসের হিসাবকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করে ওএনএস। জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাজ্যের জিডিপি ০.৪ শতাংশ বেড়েছে। জুন পর্যন্ত তিন মাসেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল একই—০.৪ শতাংশ।

ডয়চে ব্যাংকের প্রধান যুক্তরাজ্যবিষয়ক অর্থনীতিবিদ সঞ্জয় রাজা বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি এখন উপেক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবার এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের ব্যয়যোগ্য আয় চাপে পড়লেও ব্যয় অব্যাহত রেখেছে।

বাজেটের আগে স্বস্তি
অর্থনীতির প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর জন হিলির জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর। আগামী ২৮ অক্টোবর তার প্রথম বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

জন হিলি বলেন, গুরুতর বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্রিটিশ অর্থনীতি প্রত্যাশিত স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে। বছরের প্রথমার্ধে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি জি৭ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্রুততম ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রবৃদ্ধি এখনও ভঙ্গুর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ব্রিটেনেও পড়ছে—পরিবারের সাপ্তাহিক বাজার খরচ থেকে শুরু করে সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয় পর্যন্ত এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

তেলের দাম বাড়ায় নতুন শঙ্কা
অর্থনীতির সর্বশেষ ইতিবাচক পরিসংখ্যানের পাশাপাশি সামনে বড় ঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের অনেক ওপরে উঠে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামেও পড়ে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তখন সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। ফলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় আগের চ্যান্সেলর যে প্রায় ২৪ বিলিয়ন পাউন্ডের আর্থিক ‘হেডরুম’ বা বাজেটীয় ব্যবধান তৈরি করেছিলেন, তার অন্তত অর্ধেক ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর ফলে আগামী বাজেটে হিলিকে কর বাড়ানো অথবা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

সুদের হার নিয়ে নতুন হিসাব
তেলের দামের সাম্প্রতিক উল্লম্ফনের পর আর্থিক বাজারে ভবিষ্যৎ সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশাও বদলে গেছে। বাজার এখন ধারণা করছে, আগামী ১২ মাসে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড চার দফায় ০.২৫ শতাংশ করে সুদের হার বাড়াতে পারে।

তবে আগামী সপ্তাহে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নয় সদস্যের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে তাৎক্ষণিকভাবে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখনও কম। বর্তমানে সুদের হার ৩.৭৫ শতাংশে রয়েছে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে, আগামী বৈঠকে তা অপরিবর্তিত থাকবে।

অ্যাকাউন্টিং সংস্থা আইসিএইডব্লিউর প্রধান অর্থনীতিবিদ সুরেন থিরু বলেন, সর্বশেষ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে থাকা নীতিনির্ধারকদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে সেপ্টেম্বরেই সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কম। কারণ অধিকাংশ নীতিনির্ধারক এখনো আশা করছেন, অর্থনীতির দুর্বল গতি শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করবে।

গরম আবহাওয়া ও বিশ্বকাপেরও প্রভাব
জুলাইয়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এআই ও প্রযুক্তিখাতের পাশাপাশি গ্রীষ্মের উষ্ণ আবহাওয়া এবং ফিফা বিশ্বকাপেরও প্রভাব ছিল বলে জানিয়েছে ওএনএস।

ওএনএসের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিভাগের পরিচালক লিজ ম্যাককিওন বলেন, কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, উষ্ণ আবহাওয়া ও ফিফা বিশ্বকাপ তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেছে। তবে বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব একরকম ছিল না—কিছু ব্যবসা এতে লাভবান হয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সরকারের দাবির বিপরীতে বিরোধীদের সমালোচনা
তবে অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধিকে সরকারের সাফল্য হিসেবে দেখাতে রাজি নয় বিরোধী দল। ছায়া চ্যান্সেলর অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ বলেন, লেবার সরকারের কারও এ নিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার কারণ নেই।
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাজ্যের নির্মাণ ও উৎপাদন খাত সংকুচিত হচ্ছে, লেবার সরকারের সময়ে বেকারত্ব বেড়েছে এবং প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয় এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

ফলে জুলাইয়ের অপ্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দিলেও সামনে জ্বালানির উচ্চমূল্য, মূল্যস্ফীতির চাপ, সুদের হার এবং সরকারি ঋণের ব্যয়ের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলো অর্থনীতির জন্য নতুন প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই এখন বিশেষভাবে নজরে রয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, বিবিসি, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights