যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানের জবাব
প্রতিদিন ডেস্ক
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাবে নিজেদের জবাব পাঠিয়েছে ইরান। গতকাল মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই জবাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা।
জবাবে ইরান জানিয়েছে, তারা চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং পারস্য উপসাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার আগে ইরান এই বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পূর্ণ নিশ্চয়তা চায়। দুই পক্ষ থেকে কয়েকটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, সর্বসাম্প্রতিক শান্তি প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধে একটি অস্থায়ী সমঝোতা স্মারকে উপনীত হওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ একটি চুক্তির জন্য (যে চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচির মতো কণ্টকাকীর্ণ বিষয়ও থাকবে) আলোচনা চলার সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল চালু রাখা। ইরান বলছে, তারা আলোচনা চলার মাঝেই দুইবার হামলার শিকার হয়েছে। সুতরাং, এই মুহূর্তে তারা যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে তা হল, যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায় সেটি।
আর এ বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলো এবং নিরাপত্তা পরিষদের গ্যারান্টিসহ কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছা যায় সেটি, যে চুক্তিতে এই নিশ্চয়তা থাকবে যে, যুদ্ধ ফের হবে না।
এরপর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন বাস্তবতার অন্যান্য কন্টকাকীর্ণ বিষয়গুলোর দিকে মনোনিবেশ করতে পারে। ‘সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আব্বাস আসলানির মতে, এই পর্যায়ে সমঝোতার বিষয়টি হতে পারে আস্থা গড়ে তোলার একটি পদক্ষেপ।
তিনি সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরান ‘হ্যাঁ বা না জবাব’ দেয়নি। বরং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের বিষয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছে।
আবার ড্রোন হামলা : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশে ড্রোন হামলা হয়েছে। এই হামলায় কাতারে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আগুন ধরে গেলেও কুয়েত এবং আমিরাতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য জানা যায়নি। গতকাল ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে পৃথক এসব হামলার তথ্য জানানো হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, দেশটির দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। এর আগে রাতভর কুয়েতমুখী ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে কাতারের উপকূলের কাছে একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ অজ্ঞাত উৎস থেকে ছোড়া প্রজেক্টাইলে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আগুন ধরে যায়।
এ তথ্য জানিয়েছে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর এই সংস্থাটি জানায়, আঘাতের ফলে ছোট আকারের আগুন লাগলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজে আঘাত হানার ইরানি হুঁশিয়ারি : ওমান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র দুটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা চালানোর পরদিন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক হুঁশিয়ারিতে বলেছে, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে কোনো ধরনের হামলা বা হস্তক্ষেপ হলে ওই অঞ্চলে থাকা কোনো একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ও ‘শত্রুর জাহাজে’ কঠোর পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে। আলজাজিরা জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। এতে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে শত শত জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে। আটকা পড়া এই জাহাজগুলোকে হরমুজের সংকীর্ণ জলপথ পার করার লক্ষ্য নিয়ে নিয়ে ৪ মে ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ নামের একটি অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছিল মার্কিন নৌবাহিনী। কিন্তু এই অভিযান শুরুর চেষ্টা করতেই পারস্য উপসাগরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান।
ট্রাম্প যা বললেন : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় অগ্রগতি না হলে অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম আবারও শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এবারে অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’। এই অভিযানের লক্ষ্য হবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা।
স্থানীয় সময় গত শনিবার হোয়াইট হাউসের সামনে সাউথ লনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যদি কোনো অগ্রগতি না হয়, তাহলে আমরা আবার প্রজেক্ট ফ্রিডমে ফিরে যেতে পারি। তবে সেটি হবে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম প্লাস’।
পুতিনের সতর্কবার্তা : ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে গোটা বিশ্বকে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। পুতিন বলেন, এই যুদ্ধ যদি চলতে থাকে তবে ‘সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিঘিœত করছে। মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে সন্দেহ : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় গত শুক্রবার ‘ওয়াশিংটনের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের বিষয়ে’ বলেছিলেন, তিনি ‘সম্ভবত রাতের মধ্যেই’ ইরানের জবাব পাবেন বলে আশা করছেন। তবে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরান কোনো জবাব পাঠিয়ে থাকলেও এ পর্যন্ত তার কোনো প্রকাশ্য ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি; বরং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইরানের বার্তা সংস্থা আইএসএনএর খবর অনুযায়ী, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে আরাগচি বলেন, ‘পারস্য উপসাগরে মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন কূটনৈতিক সমাধানের পথে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়েছে।’
হরমুজে যুক্তরাজ্যের যুদ্ধজাহাজ : এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সুরক্ষার জন্য সম্ভাব্য বহুজাতিক প্রচেষ্টার প্রস্তুতি হিসেবে যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগনকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য। গত শনিবার দেশটির পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই মার্চে সাইপ্রাসকে রক্ষায় সাহায্য করতে এইচএমএস ড্রাগন নামের আকাশ প্রতিরক্ষা বিধ্বংসী জাহাজটিকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজটির স্থানান্তর এমন এক সময় ঘটল, যখন ফ্রান্স দক্ষিণ লোহিত সাগরে তাদের বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেছে; কারণ উভয় দেশ এই বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি প্রতিরক্ষামূলক পরিকল্পনা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছে।
ইরানের ইউরেনিয়াম নিয়ে ‘টানাটানি’ : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করে আসছে, ইরানের হাতে বর্তমানে শত শত কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ। এই ইউরেনিয়াম আর কিছুটা সমৃদ্ধ করে বোমা তৈরি করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই মজুতই এখন ইরানকে ‘পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি অবস্থানে’ রেখেছে বলে ধারণা অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি ও সমাঝোতার যে আলোচনার তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে- তার মূলে রয়েছে ‘উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’। যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, তারা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজেদের কাছে স্থানান্তর ও সংরক্ষণ করতে প্রস্তুত।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে দুই পরাশক্তির এই টানাটানি নিয়ে অবশ্য এখনো প্রকাশ্য কোনো অবস্থান জানায়নি। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর নিয়ে ইরানের বড় ধরনের দ্বিধা রয়েছে। দেশটির কট্টরপন্থিরা মনে করেন, ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো মানেই আত্মসমর্পণ। আবার বাস্তববাদীরা মনে করেন, অর্থনীতি বাঁচাতে এবং যুদ্ধ এড়াতে একটি সমঝোতা প্রয়োজন।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান কখনোই ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে চাইবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রকেই তারা প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে। ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির ওপরও তেহরানের আস্থা নেই। অন্যদিকে রাশিয়ায় ইউরেনিয়াম পাঠানোর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও ঝুঁকি দেখছে ইরান। ইরানের আশঙ্কা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইস্যুতে মস্কো শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ দেখতে পারে। দরকার হলে রাশিয়াও ইরানের ইউরেনিয়ামের বিষয়টি পশ্চিমাদের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সীমিত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। আলোচনায় ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে কাজ চলছিল। সেখানে ইউরেনিয়াম বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নটি ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। ইরান কয়েক বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করতে পারে- এমন ইঙ্গিত ছিল। তবে মজুত ইউরেনিয়াম কোথায় যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে কঠোর ভাষাও ব্যবহার করছে। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার সামরিক হামলা হতে পারে। ফলে ইরানের সামনে এখন মূলত তিনটি পথ খোলা- এক. ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠিয়ে সীমিত সমঝোতায় যাওয়া, দুই. আংশিক সমঝোতার মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করা এবং তিন. কোনো ছাড় না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া।
