রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে প্রশাসন
ওয়াজেদ হীরা
চাকরি জীবনে ভালো পোস্টিং ও পদোন্নতি পেতে এক যুগ ধরে নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের আদর্শের কর্মী হিসেবে জাহির করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন সরকারি কর্মচারীরা। গণ অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনা থেকেও শিক্ষা নেননি তাঁরা। ওই ক্ষমতাচ্যুতির পর পদচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারকে সহযোগিতা করা সচিবসহ অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। ওএসডি করে রাখা হয়েছে গত সরকারের সময়ে ‘দালালি’ করা কর্মকর্তাদেরও। এর পরও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে জড়াচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সকালসন্ধ্যা রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হাজির হচ্ছেন। রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও যাচ্ছেন। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অনেকটা প্রতিযোগিতা চলছে-কে কার আগে বিএনপি, জায়ায়াত বা এনসিপি হতে পারেন তা নিয়ে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনে সেই প্রতিযোগিতা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন দল থেকে প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তা নিয়মিত যোগাযোগ ও যাতায়াত করেন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে। রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবেও নিজেদের পেশার মানোন্নয়নের চেয়ে দলীয় আলোচনাই বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক দৌড় বেশি দেখা যাচ্ছে। এক সময় যারা তারেক রহমানের নামই শুনতে পারতেন না, তারেক রহমান দেশে ফেরার পর তাদের অনেকেই বিএনপির শুভাকাক্সিক্ষ পরিচয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
এ ছাড়া রাজধানীর গুলশান, পল্টন কার্যালয়ে আমলাদের যাতায়াত এখন অনেকটাই প্রকাশ্য। জামায়াতের কার্যালয়েও যাচ্ছেন জামায়াতঘেঁষা কর্মকর্তারা। সুবিধাভোগী অনেক কমকর্তা এনসিপি নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে আমলাদের একটা অংশ ছাত্রনেতাদের পেছনে ঘুরে নিজেদের ফায়দা নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরাই এখন ভোল পাল্টে অন্য দলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। অতিরিক্ত সচিবরা দৌড়াচ্ছেন সচিব হওয়ার জন্য। এ ছাড়া উপসচিব-যুগ্মসচিবরা রাজনৈতিক সুবিধায় নিজেদের পদোন্নতি ও ভালো পোস্টিং পেতে দৌড়াচ্ছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘রাজনৈতিক তাঁবেদারি করা, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ আইনের লঙ্ঘন। এটা বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও নিরপেক্ষ থেকে মূল্যায়ন করেনি। যাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে বা নেতাদের কাছে ঘোরাঘুরি করেন, তাঁদের প্রশ্রয় না দিয়ে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে এসব কমে আসত।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাঁরা রাজনৈতিক সুবিধার আশায় ঘোরেন তাঁরাই ভালো পর্যায়ে যান। এতে নিরপেক্ষ, সৎ কর্মকর্তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। সুতরাং প্রশাসনে যেভাবে লেজুড়বৃত্তি বেড়েছে বা যে অবস্থায় প্রশাসন পৌঁছেছে; পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার বিষয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর ২০২৪ সালে গণ অভ্যুত্থানের আগের দিন পর্যন্ত ‘আওয়ামী কর্মচারী’র ভিড়ে অন্যদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। পদোন্নতি, ভালো পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে অন্যদের ছেঁটে ফেলতে কাউকে জামায়াত বা বিএনপি ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হতো। আবার গণ অভ্যুত্থানের পর থেকেই সবাই ‘আওয়ামীবিরোধী’ হয়ে গেছেন। কেউ ভালো পোস্টিং বা পদোন্নতি সামনে এলে এক দোসর আরেকজনকে বড় দোসর আওয়ামী ট্যাগ লাগাচ্ছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নিয়ে গত বছর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা (কর্মকর্তা) কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে পারবে না। সিভিল সার্ভিসের মান সমুন্নত রাখতে হবে। কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া যাবে না। এ ছাড়া সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ বিধি ২৫-এ রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেওয়া বা সহায়তা করা নিষিদ্ধ।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু আমলাদের বেপরোয়াভাবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লেও এ নিয়ে যেন কারও কিছু করার নেই!
ফলে আওয়ামী লীগকে ডোবানো আমলারা এবার নতুন করে রং পাল্টে মিশে যাচ্ছেন ক্ষমতায় আসতে যাওয়া দলের সঙ্গে। বিগত সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন আমলারা।
