রানা প্লাজায় যমদূতকে হারানো সেই নাসিমা শেষ পর্যন্ত হারলেন দৌলতদিয়া ঘাটে

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :

১৩ বছর আগে সাভারের রানা প্লাজা যখন ধসে পড়েছিল, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই বিভীষিকার ভেতরে টানা তিন দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন নাসিমা বেগম। চারিদিকে লাশের স্তূপ আর বাঁচার আর্তনাদ ছাপিয়ে সেদিন অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছিলেন তিনি। সবাই বলেছিল, নাসিমার ভাগ্যটা বোধহয় পাথরে খোদাই করা, মৃত্যুও তাকে ছুঁতে পারেনি।
কিন্তু সেই পাথরচাপা ভাগ্য এবার আর সহায় হলো না। জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে হার মেনে নিলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুরের সেই লড়াকু নারী। এবার যমদূত তাকে কেড়ে নিল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায়।
স্বামী নূর ইসলামের মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলেন নাসিমা। অভাবের তাড়নায় আবারও সেই ঢাকার পথেই পা বাড়াতে হয়েছিল তাকে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সাভারে ভাগনি আজমিরার বাসায় গিয়েছিলেন একটা চাকরির আশায়। মাসখানেক হন্যে হয়ে ঘুরেও যখন কিছু জুটল না, তখন গত ২৫ মার্চ ফরিদপুর থেকে ভাগনির সাথে বাসে চড়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। সাথে ছিল ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা, ৪ বছরের ছোট্ট নাতি আব্দুর রহমান আর ভাগনি জামাই আজিজ। কে জানত, জীবিকার এই খোঁজই হবে জীবনের শেষ যাত্রা?
দৌলতদিয়া ঘাটে পন্টুন থেকে বাসটি যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়, তখন মুহূর্তেই সব ওলটপালট হয়ে যায়। ভাগনি জামাই আব্দুল আজিজ কোনোমতে প্রাণ বাঁচালেও রাক্ষুসে নদী কেড়ে নেয় নাসিমা, তার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আর নিষ্পাপ শিশুটিকে। নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা পর যখন তাদের নিথর দেহ ভেসে উঠল, তখন নদী তীরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজনদের কান্নায়।
নাসিমার নিয়তি যেন তাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শান্তিতে থাকতে দেয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে তার মরদেহ নিয়ে পার্বতীপুরের পথে রওনা দেন স্বজনরা, তখন কুষ্টিয়ার কাছে গিয়ে হঠাৎ চলন্ত গাড়ির চাকা ফেটে যায়। আবারও দুর্ঘটনার মুখে পড়ে লাশবাহী গাড়িটি। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর শুক্রবার ভোরে তার নিথর দেহ পৌঁছায় নিজ গ্রামে। দুপুরে জানাজা শেষে চিরতরে মাটির নিচে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েন এই লড়াকু নারী।
খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে ছুটে যান পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদ্দাম হোসেন। তিনি ব্যক্তিগত ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দেন। এছাড়া কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
রানা প্লাজার সেই পাহাড়সম কংক্রিট যাকে মারতে পারেনি, তাকে কেড়ে নিল নদীর পানি। বিধাতার এই অদ্ভুত লিখন মেনে নিতে পারছেন না গ্রামবাসী। সাভারে জয়ী হওয়া নাসিমা আজ হেরে গেলেন দৌলতদিয়া ঘাটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights