রামিসা হত্যা মামলার রায়: পর্যবেক্ষণে যা বললেন বিচারক

অনলাইন ডেস্ক

‘শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।’

রবিবার রামিসা হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। রায়ে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে বিচারক আরও বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে গঠিত এ ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে এক হাজার আট শতাধিক বিচারাধীন মামলার দায়িত্ব পালন করছে, যার প্রতিটি মামলাই শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা, একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের জন্য প্রতীক্ষারত অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা। সেই প্রেক্ষাপটে শিশু রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।’

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে, তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে, বিজ্ঞ প্রসিকিউশন মামলার সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সম্মুখে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং বিচারকার্যে সংশ্লিষ্ট সবার এই আন্তরিকতা ও পেশাদারত্ব প্রশংসার দাবিদার। আদালত এও প্রত্যাশা করে যে, শিশু রামিসার মামলার ন্যায় দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাতেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারপ্রার্থী জনগণ এবং বিশেষত ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার যেন অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ একই রকম নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এটাই এই আদালতের প্রত্যাশা।’

বিচারক আরও বলেন, একটি ন্যায়সঙ্গত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষী এবং বিচার ব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচারের লক্ষ্য অর্জিত হয়। আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতিমালার আলোকে সত্য উদ্ঘাটন করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights