রাসায়নিক দিয়ে নারীদের হাত পুড়িয়ে জ্বীনের ভয়, প্রতারক তিন ‘তান্ত্রিক’ গ্রেফতার

অনলাইন ডেস্ক
ফেসবুকে তান্ত্রিক সেজে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কথা বলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রতারক চক্রের সদস্যরা পটাশিয়াম ও চিনির রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নারীদের হাতে আগুন দিয়ে ভয় দেখিয়ে ক্ষত সারানোর নামে অর্থ আদায় করতেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর দক্ষিণ কল্যাণপুরে পিবিআই স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন্স (উত্তর) কার্যালয়ে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী।

এর আগে ২৪ জুলাই মধ্যরাতে কুমিল্লার চান্দিনা থানাধীন হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই প্রতারক চক্রের প্রধান অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলমকে (২৭) গ্রেফতার করে পিবিআই স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন্স (এসআইঅ্যান্ডও) এর একটি টিম। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন ভোর ৭টা ৪০ মিনিটে নোয়াখালীর সুধারাম থানাধীন পূর্ব এজবালিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়ার ছোট ভাই মো. হাসান আলী (২০) নামের আরেক জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একাধিক ফোন ও সিম উদ্ধার করা হয়েছে।

মো. ফজলে এলাহী বলেন, সালমা আক্তার নামের এক নারী ফেসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামের একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার প্রলোভন দেখিয়ে ওই তান্ত্রিক প্রথমে হাদিয়া বাবদ তার কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং পরে জালালী কবুতর কেনার অজুহাতে আরও সাড়ে ৩ হাজার টাকা বিকাশের মাধ্যমে গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলে ভুক্তভোগীকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনতে এবং ইমু ভিডিও কলে তার নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে বলে। নির্দেশনা অনুসরণ করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ভুক্তভোগীর বাম হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও ১৬ হাজার টাকাসহ মোট ২১ হাজার টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে গত ২১ জুন খিলক্ষেত থানা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ আইনে মামলা করে।

তিনি বলেন, পিবিআই মামলাটির তদন্তভার গ্রহণের পর তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়া, মাহে আলম ও মো. হাসান আলীকে গ্রেফতার করে। তারা প্রতারণার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকার করেছেন এবং অহিদ মিয়া ও হাসান আলী ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

গ্রেফতাররা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য জানিয়ে তিনি বলেন, চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’ এবং ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তান্ত্রিক পরিচয়ে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন নারীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত। এরপর তারা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালুতে, নাভিতে নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে নির্দেশ দিত। এর ফলে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের হাতে ও নাভিতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হতো। পরে ওই ক্ষত জ্বীনের মাধ্যমে সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এবং জ্বীনের ভয় দেখিয়ে বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত।

তিনি বলেন, চক্রটি ভারতেও একই ধরনের ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা এবং ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করত। বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও তদবিরের নামে অর্থ গুগল পে-এর মাধ্যমে গ্রহণ করে পরবর্তীতে হুন্ডির মাধ্যমে তারা সেই অর্থ বাংলাদেশে এনে আত্মসাৎ করত। তারা তাদের পরিচালিত ভুয়া ফেসবুক পেজগুলো অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে নিয়মিত বুস্টিং করত, যাতে ভুয়া তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা ছড়িয়ে দিয়ে নতুন নতুন ভুক্তভোগীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে।

কতজন ভুক্তভোগী এই ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।

প্রতারক চক্রটি কীভাবে পটাশ-চিনির রাসায়নিক বিক্রিয়া শিখেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গ্রেফতাররা ইউটিউবে দেখে জানতে পারে, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের সঙ্গে চিনি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু দিলে আগুনের সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই তারা এই প্রতারণার কৌশল শিখেছে। তারা বেদে সম্প্রদায়ের সদস্য এবং তাদের গ্রামের অনেকেই এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত।

এমন কয়টি মামলা পিবিআই’র কাছে আছে জানতে চাইল তিনি বলেন, এ ধরনের আরও অন্তত চারটি মামলা বর্তমানে পিবিআই তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে কার্ড-ভিত্তিক প্রতারণাও রয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতারক চক্রটির অন্যান্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights