লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা হুথিদের, নেপথ্যে ইরানের কলকাঠি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নৌ-অবরোধ ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক ফি বা শুল্ক আরোপের মারাত্মক পরিকল্পনা করছে ইয়েমেনের সশস্ত্রগোষ্ঠী হুথি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মূলত বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বেশির ভাগ জাহাজের ওপর এই শুল্ক আরোপের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চলমান ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে পারস্য উপসাগরের বাইরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ রুট ও অন্যান্য পণ্যবাহী নৌযানের ওপর হামলা জোরদার করার অংশ হিসেবেই হুথিদের এই নতুন পদক্ষেপকে দেখা হচ্ছে। তবে এই শুল্কব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কবে থেকে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনো জানা যায়নি।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরান সফর করেন হুথির শীর্ষ কর্মকর্তারা। তেহরানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ওপর রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, সফররত হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিটিংয়ে বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেন ইরানি কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাধারণ নীতি বা শুল্ক আদায়ের এই সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোটাই এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। তবে কৌশলগত সমঝোতার অংশ হিসেবে চীনা জাহাজগুলোকে এই ফি বা শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হবে এবং হুথিরা এই ছাড়ের সিদ্ধান্তে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌদি তেলের ক্রেতা দেশ চীন ইতিমধ্যে হুথিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে লোহিত সাগরে নিজেদের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করেছে।

ইয়েমেনের বাব আল-মানদেবে এই শুল্ক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্য তেহরান থেকে ফেরত আসা হুথি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি ইরানি সামরিক ও প্রযুক্তিগত উপদেষ্টারা ইয়েমেনে পৌঁছেছেন বলে আঞ্চলিক এক আরব কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। এই বিষয়ে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মনোনীত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরা আল-জউবা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হুথিরা যেকোনোভাবেই লোহিত সাগরের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এবং তারা সফল হলে সেখানে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে জোরপূর্বক শুল্ক আদায় করার চেষ্টা করবে।

যদিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিস্তৃত নৌশক্তি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে এবং এর বিপরীতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে, তবু পারস্য উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় দেশগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে হুথিদের এই পদক্ষেপ। অন্যদিকে, ওমান প্রস্তাবিত হরমুজ প্রণালির আঞ্চলিক যৌথ ব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাসেবী ফি ব্যবস্থার প্রস্তাব ইরান বুধবার বাতিল করে দিলে দুই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর আশা ভেস্তে যায়।

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ বা সেখানে শুল্ক আরোপের ঘটনায় সরাসরি চরম হুমকির মুখে পড়ছে প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালির একমাত্র বিকল্প হিসেবে এই রুটটি বন্ধ হলে দেশটিতে চরম জ্বালানিসংকট তৈরির ঝুঁকি প্রবল হচ্ছে। গত ২০২০ সাল থেকে গাজা যুদ্ধের সমর্থনে শুরু হওয়া হুথি হামলার পর থেকে লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। গত বছরের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সেই হামলার সমাপ্তি ঘটলেও, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই সৌদি আরবের জিযান বন্দরের কাছে অন্তত একটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে হুথিরা, যার দায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করেছে।

জাতিসংঘের প্যানেল অব বিশেষজ্ঞ দলের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিরা এর আগেও লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর দিয়ে যাতায়াতকারী নির্দিষ্ট কিছু শিপিং এজেন্সির কাছ থেকে নিরাপদ পারাপারের বিনিময়ে কোটি কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অনিশ্চিত সেই সূত্রের তথ্যানুযায়ী, তখন তারা প্রতি মাসে প্রায় ১৮ কোটি ডলার বা ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত অবৈধ শুল্ক আদায় করেছিল।

বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাব আল-মানদেব প্রণালি ব্যবহার করে এশিয়ায় পৌঁছাতে গড়ে ১৬ দিন সময় লাগে, যেখানে বিকল্প হিসেবে উত্তর লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে জাহাজ পাঠাতে গড়ে দীর্ঘ ৫০ দিন সময় লেগে যায়।

হুথিদের গণমাধ্যম দফতর থেকে এই নতুন শুল্কব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights