শি জিনপিংয়ের ভারত সফর নিয়ে ধোঁয়াশা
অনলাইন ডেস্ক
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা বাকি থাকলেও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর ঘিরে রহস্য ও ধোঁয়াশা জিইয়ে রেখেছে বেইজিং। চীনা প্রেসিডেন্ট এই সম্মেলনে সশরীরে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে বেইজিং এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট কোনো বার্তা দেয়নি। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার কোনো দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে কি না সে বিষয়েও বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
চীনের প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য এই সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির পক্ষ থেকে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, শি জিনপিংয়ের সফরের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা নেই। যদি শেষ মুহূর্তে শি জিনপিং এই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে এটি হবে গত সাত বছরের মধ্যে তার প্রথম ভারত সফর। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান চরম সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান সংহত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে একতাবদ্ধ বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকেই ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক ধরনের সংশয় ও সতর্কতা কাজ করে আসছে। বিশেষ করে ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যাকায় রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ওই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং চীনা বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান।
তবে গত বছর চীনে অনুষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের পর থেকে দুই দেশের মধ্যকার বরফ কিছুটা গলতে শুরু করে। বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে দুই দেশই অস্থিরতার মুখোমুখি হওয়ায় বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কের গতিপথ বদলাতে শুরু করে। গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীনা বিনিয়োগের ওপর ভারত যে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, নতুন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লি তা কিছুটা শিথিল করেছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, ক্যাপিটাল গুডস এবং সোলার সেল খাতে চিনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় ও চিনা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগকে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে ভারত সরকার।
সম্প্রতি মধ্য এশিয়ার কিরগিজস্তানে আয়োজিত একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের ফাঁকে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিং। সেই বৈঠকের সূত্র ধরে চিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, উভয় নেতাই বিশ্বাস করেন যে ভারত ও চিন পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং অংশীদার। দুটি দেশই একে অপরের বিকাশের ক্ষেত্রে হুমকি না হয়ে সুযোগ হিসেবে কাজ করে।
তবে কূটনৈতিক বার্তা ইতিবাচক হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কিছু জটিলতা এখনও রয়ে গেছে। বার্তা সংস্থার সূত্রের খবর অনুযায়ী, চীনা কোম্পানিগুলোর ভারতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খোদ বেইজিংয়ের দিক থেকেও এখন কড়া নজরদারি ও স্ক্রুটিনি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চমানের প্রযুক্তি বা অত্যাধুনিক উৎপাদন শিল্পের মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে চীন সরকার নিজের দেশের প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এত সব টানাপোড়েনের মধ্যেও ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য নতুন রেকর্ড গড়েছে। চীনের কাস্টমস তথ্যানুযায়ী, গত বছর দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ১২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ১৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেও বাণিজ্য বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে দুই দেশের সম্পর্ক ঘিরে গভীর একটি ‘আস্থার সংকট’ এখনও বিদ্যমান। রেগুলেটরি জটিলতার কারণে ঝুলে থাকা বিনিয়োগ, ভিসা প্রদানে বিলম্ব এবং শিল্পসামগ্রী আমদানির ক্ষেত্রে কড়াকড়ির মতো বিষয়গুলো স্পষ্ট করে যে কূটনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সম্পর্কে বাস্তব বাধা এখনও কাটেনি। এ কারণেই ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিক লিন মিনওয়াং জানিয়েছেন, চীন অবশ্যই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, তবে ভারত প্রকৃতপক্ষে কতটা সদিচ্ছা দেখাবে বেইজিং তার ওপর নজর রাখছে। তবে তিনি এটাও ইঙ্গিত দেন যে, এক বৈঠকে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে নয়াদিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পন্থ জানান, দুই দেশের মধ্যকার আস্থার ঘাটতি এখনও অনেক বেশি। তবে বিশ্ব বাণিজ্য ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি যখন দু দেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। তখন চীনের অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভারত ও চীনের সম্পর্ক একটি নির্ভরযোগ্য জায়গায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
