শিক্ষকরা সরব ছিলেন আন্দোলনে
আকতারুজ্জামান
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা আন্দোলন-সংগ্রাম লক্ষ করা গেছে চলতি বছরজুড়েই। অন্তর্বর্তী সরকারের এ আমলে এইচএসসি ও সমমানের ফল গত ২০ বছরের ইতিহাসে কমে এসেছে। তলানিতে নেমেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তিও। ফল কমেছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও। এ বিষয়টি নিয়ে সমালোচনায় মুখর ছিলেন চলতি বছরের পরীক্ষার্থী, ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকরা। রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে বছরজুড়েই থেমে থেমে আন্দোলনে ছিল শিক্ষার্থীরা। সব মিলে শিক্ষা খাতে বছরজুড়েই ছিল নানা আলোচনা-সমালোচনা। চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন হয়েছে দীর্ঘ বছর পর। আর এসব নির্বাচনে সিংহভাগ পদেই বিজয়ী হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা।
এ ছাড়া একের পর এক ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বরাবরের মতো চলতি বছরের শুরুতেও সময়মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ফেব্রুয়ারিতে এসে ধীরে ধীরে সে সংকট কাটলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নিয়মিত পাঠদান প্রক্রিয়ায়।
তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাইয়ে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফলে পাস করে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় ফল কমে যায় ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ কমে যায় ৪৩ হাজার ৯৭ জনের। আর অক্টোবরে প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমানের ফলে যেন ধস নামে। প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থী এ পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করেছে। সারা দেশে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বিপুল পরিমাণে কমেছে। উত্তীর্ণদের মধ্যে সারা দেশে জিপিএ-৫ পেয়েছিল মাত্র ৬৯ হাজার ৯৭ জন। গত বছরের তুলনায় এইচএসসির ফলে জিপিএ-৫ কমেছে ৭৬ হাজার ৮১৪ জনের। এ পাবলিক পরীক্ষার ফলের পরেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন তুলনামূলক কম ফল করা শিক্ষার্থীরা।
চলতি বছর দাবিদাওয়া নিয়ে রাস্তার আন্দোলনে সরব ছিলেন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। জাতীয়করণ দাবির পাশাপাশি জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা বৃদ্ধির দাবি ছিল এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস বর্জন করে দাবি আদায়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দিনের পর দিন বিক্ষোভ করেছেন তারা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধিতে সম্মতি দিয়েছে সরকারের অর্থ বিভাগ। গত নভেম্বর থেকে বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৭.৫ শতাংশ হারে (সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা) এবং ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে অতিরিক্ত আরও ৭.৫ শতাংশসহ মোট ১৫ শতাংশ হারে (সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে।
সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড দশম করাসহ তিন দফা দাবিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বৃহৎ আন্দোলন শুরু করেন গত নভেম্বরে। তাদের আন্দোলনের কারণে সারা দেশে স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষাও বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের চাপে পড়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষকরা। শিক্ষকদের আন্দোলন দমাতে নেতৃত্বে থাকা ৪৩ শিক্ষক নেতাকে বিভিন্ন জেলায় বদলি করে সরকার। পরে গত ৪ ডিসেম্বরে এসে আন্দোলন প্রত্যাহার করলে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে।
দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি আর শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার পর জটিলতা বেড়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে। রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজ নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন বাস্তবায়ন করা নিয়ে দিনে দিনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অনিশ্চয়তা বাড়ছে প্রস্তাবিত খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মডেল বাস্তবায়ন নিয়েও। এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, খসড়া অধ্যাদেশের মডেল অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভার্চুয়াল পাঠদান করা হলে শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নানান ডামাডোলের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পয়লা ডিসেম্বর থেকে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরুর আশ্বাস দিলেও সাত কলেজ শিক্ষকরা ঘোষণা দিয়েছেন- তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেবেন না, হবে না ওরিয়েন্টেশেনও। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের কারণে তারা মতবিনিময় বা পরিচিতি পর্বের আয়োজন করবেন। এদিকে গত ২৫ ডিসেম্বর প্রস্তাবিত এ বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি সরকার।
