শিল্পনগরীতে শিল্পের দেখা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল সৃষ্টি হলেও পিছিয়ে উত্তরবঙ্গ। যদিও শিল্পে রূপান্তরের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই ধরনের একটি চেষ্টা করা হয়েছিল রাজশাহীতে। তৈরি করা হয়েছিল বিসিক শিল্পনগরী-২। রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ পবা উপজেলার কেচুয়াতৈল এলাকায় গড়ে তোলা হয় এ শিল্পনগর। কিন্তু চার বছরে মাত্র পাঁচটি প্লটে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অর্থাৎ চিন্তা আছে, চেষ্টা আছে কিন্তু শিল্পের দেখা নেই।

অবশ্য এ নিয়ে উদ্যোক্তাদের আছে বিস্তর অভিযোগ। তার মধ্যে আছে প্লটের অতিরিক্ত মূল্য, ইউটিলিটি সেবা অনুপস্থিতি ও ব্যাংকিং সহায়তার অভাব। বিসিক এ শিল্পনগরীতে ২৮৬টি শিল্প প্লট আছে। চার বছরে মাত্র ৯টি প্লটে শিল্প কার্যক্রম শুরু হলেও বাকিগুলো ফাঁকা পড়ে আছে এখনো। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, যারা প্লট বরাদ্ধ নিয়েছে, তাদের অনেকের অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। যারা কার্যক্রম শুরু করেনি তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহী বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প করপোরেশন) দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কসংলগ্ন পবার কচুয়াতৈল মৌজায় ৫০ একর জমিতে গড়ে ওঠা বিসিক-২ প্রকল্পটি চার বছর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ১৫০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে ২৮৬টি শিল্প প্লট আছে। এখানে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়নের লক্ষ্য থাকলেও তা অন্ধকারে আছে। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্লটগুলোর বেশির ভাগই পড়ে আছে ফাঁকা। সেখানে গজিয়ে উঠছে কাশবন।

গত চার বছরে ২৮৬টি প্লটের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭১টি। এর মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে ৯টি। মহানগরীর সপুরা এলাকায় বিদ্যুৎ, গ্যাসসংকটের সমাধান না করেই ২০২২ সালে দেড় শ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী-২। প্লট নিতে প্রতি কাঠায় খরচ প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা।

ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সমিতির সদস্যসচিব সৈয়দ আহমেদ জাকী বলেন, প্রকল্পটি অপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বিসিকের আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজীদ বলেন, জেলার দুই শিল্পাঞ্চলকেই ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের পাশাপাশি এখানে প্লটের জন্য আবেদন করতে পারেন ৫০ কোটি মূলধনের মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারাও।

সরেজমিন দেখা যায়, বিসিক-২ প্রধান ফটক পেরিয়েই রাখা হয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট। তবে সেখানে কোনো কার্যক্রম নেই। পুরো এলাকায় নেই কোনো কর্মচাঞ্চল্য। বেশির ভাগ প্লট কীটনাশক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতশিল্পকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ এখানে কোনো কমন ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) নেই। এতে বিপজ্জনক বর্জ্য খোলা ড্রেনে ফেলা হলে আশপাশের পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। জানা গেছে, রাজশাহীর উষা সিল্ক প্রিন্টিং ও উইভিং ফ্যাক্টরি ২০২৪ সালে একটি প্লট চেয়ে আবেদন করেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়। প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের শুরুতে আশাবাদী ছিলাম, কিন্তু বাস্তবতা প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। তাই আমরা আর সেখানে যাইনি।’ ট্রিপল এস ইলেকট্রনিকসের ব্যবস্থাপক মো. নাসিম জানান, প্রায় এক বছর আগে প্লট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেলেও এখনো পাননি। তিনি বলেন, প্রকল্পে বিদ্যুৎসংযোগ সম্প্রতি এসেছে। কিন্তু গ্যাস ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা এখনো হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, এখানে প্লটের দাম বাজারদরের চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি। প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য যে পরিমাণ পুঁজি দরকার, তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব না। ব্যাংকগুলোও এ প্রকল্পে ঋণ দিতে অনিচ্ছুক। ফলে এখানে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
রাজশাহী বিভাগীয় নারী উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আঞ্জুমান আরা বলেন, প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য যে পরিমাণ পুঁজি দরকার, তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব না। ব্যাংকগুলোও এ প্রকল্পে ঋণ দিতে অনিচ্ছুক। ফলে এখানে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights