শিল্পী নেই, সমিতি আছে
আলাউদ্দীন মাজিদ
চিত্রনায়ক অমিত হাসানের অভিনয়জীবন কয়েক দশকের। এখন অবশ্য কাজ কমই করেন। গত বছর তিনি নিজের ফেসবুকে লিখলেন, ‘শিল্পী সমিতি আছে, কিন্তু শিল্পী নেই।’ মন্তব্যের ঘরে অনেকে অনেক কিছুই লিখেছেন। এর মধ্যে চিত্রনায়ক ওমর সানী লিখেছেন, ‘একদম সত্যি, ভালো বলেছিস।’ হঠাৎ করে কেন এমনটা লিখেছেন তিনি, জানতে চাইলে অমিত হাসান বলেছিলেন, ‘এটা আমার উপলব্ধি। এটা তো ঠিক, কাজ না থাকলে শিল্পী সমিতিতে কেউ গিয়ে তো আড্ডা দেবেন না। সেখানে গিয়ে অকারণে বসে থাকারও তো কোনো মানে হয় না। আজ যদি শিল্পীরা ভরপুর কাজে ব্যস্ত থাকতেন, এফডিসির ফ্লোরে ফ্লোরে কাজ চলত, তাহলে শিল্পীরাও শিল্পী সমিতিতে গিয়ে আড্ডা দিতেন। বসতেন, হাসাহাসি করতেন। নিজেদের গল্প বলতেন। সেই দৃশ্য তো আমরা দেখি না। তাই আমি লিখেছি। অথচ এই শিল্পী সমিতি একটা সময় প্রকৃত শিল্পীদের পদচারণে মুখর থাকত।’
চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলছেন, অমিত হাসান যথার্থই বলেছেন, প্রকৃত শিল্পীদের মনের কথাই লিখেছেন। কারণ পর্যাপ্ত সিনেমা নেই তাই শিল্পীদের হাতে কাজও নেই, কেউ বেকার, কেউবা অন্য পেশায় চলে গেছেন। তারপরও তারা চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্য। বর্তমানে এই সমিতির সদস্য সংখ্যা ৫৭৩ জন। এদের মধ্যে শুধু ৭৩ জনের হাতে কাজ আছে কি না সন্দেহ। কিন্তু নির্বাচন করতে সবাই মরিয়া। কী আছে সমিতির চেয়ারে। কেন এই চেয়ারটি এত লোভনীয়। একসময় নায়িকা নিপুণের জোর করে সমিতির সাধারণ সম্পাদকের চেয়ার দখল করার পর এই প্রশ্ন সবার মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে। চেয়ারটি দখলে রাখতে নিপুণ আইন আদালত করেও ছেড়েছিলেন, আবার আদালতের নির্দেশের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জোরপূর্বক নির্বাহী কমিটির পূর্ণ মেয়াদে চেয়ারটি নিজের দখলে রেখেছিলেন। শুধু এখানেই শেষ নয়, পরের মেয়াদেও নির্বাচনে ডিপজলের কাছে হেরে গিয়ে ফল মেনে নেওয়ার পর আবার চেয়ারটি দখলের পাঁয়তারা করেন। কিন্তু ডিপজলের কঠোর অবস্থানের কারণে নিপুণের দখলবাজি তখন আর ধোপে টেকেনি। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলছেন, যারা প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত অভিনয় করে আসছেন তাদের সমিতির কর্মকাণ্ড বা নির্বাচনে স্থান দেওয়া হয় না, অথবা প্রকৃত শিল্পীরা অশিল্পীদের তাণ্ডবে মানসম্মান বাঁচতে নির্বাচন ও সমিতি থেকে দূরে সরেন। গত কয়েক বছর ধরে যারা নির্বাচন করেন তাদের অধিকাংশের হাতে কোনো কাজ নেই, কত বছর আগে কাজ করেছেন তাও তারা জানেন না। নামমাত্র কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করে কীভাবে তারা সমিতির সদস্য হন, কীভাবে আবার নির্বাচনেও অংশ নেন। কোন গ্রেডের শিল্পী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, এসব নানা প্রশ্ন এখন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মনে অনেক বড় একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ সমিতির গঠনতন্ত্রেই কয়টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলে কেউ সদস্য হতে পারবে এ বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার সমিতি হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। যারা নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসেন বরাবরই তারা পরবর্তী নির্বাচনের জন্য নিজের ভোটব্যাংক বাড়াতে গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে নিজেদের মতো করে সদস্যপদ দিয়ে যাচ্ছেন বলেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সমিতি এত লোভনীয় কেন?
চলচ্চিত্রবোদ্ধারা বলছেন, সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে সিংহভাগই প্রয়াত হয়েছেন। অনেকে বার্ধক্যে এসে অভিনয় ছেড়েছেন। তাই মুরব্বিশূন্য শিল্পী সমিতি এখন ছেলের হাতের মোয়া হয়ে পড়েছে। এই সমিতির সাইনবোর্ড ও পদ ব্যবহার করে অনেকেই ফায়দা লুটে আসছেন। শিল্পীদের কল্যাণে সমিতি গঠন করা হয়েছে বলা হলেও সারা বছর অসহায় শিল্পীদের কল্যাণে তেমন কোনো কাজ দেখা যায় না। এমনকি শিল্পীদের পেশার উন্নয়নে কোনো কর্মশালা বা সেমিনার করা হয়েছে এমন কোনো নজিরও নেই। কিন্তু প্রতি বছর পিকনিক ও ইফতার পার্টি করতে বেশ তোড়জোড় দেখা যায়। এর অন্তরালের কারণ হচ্ছে নাকি এসব আয়োজনের নামে স্পন্সর এনে পকেট ভারী করা যায়।
পরিতাপের বিষয় হলো, শিল্পী সমিতির জন্মলগ্ন থেকে যতদিন পর্যন্ত চলচ্চিত্রের রমরমা অবস্থা ছিল ততদিন কিন্তু এসব অনিয়ম ছিল না। ডাকসাইটের শিল্পীরা এর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শিল্পীদের কর্ম ও ব্যক্তিজীবনের সার্বিক মানোন্নয়নে কাজ করে গেছেন। ১৯৮৪ সালের ১১ মে তৎকালীন ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক সোনালি অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি’। প্রথম সেই নির্বাচনে নায়করাজ রাজ্জাক সভাপতি এবং দাপুটে অভিনেতা আহমেদ শরীফ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে সমিতির হাল ধরেছিলেন। সে সময় এফডিসি মানেই ছিল তারকাদের মেলা, পরিচালক-কলাকুশলীদের মুখর আড্ডা আর নতুন নতুন সিনেমা নির্মাণের কলরব। নির্মাতা, শিল্পী, কলাকুশলীদের থই থই ভিড়ে মুখরিত থাকত এফডিসি প্রাঙ্গণ। কিন্তু কালের বিবর্তনে চার দশক পর এসে সেই সোনালি অতীত এখন কেবলই স্মৃতির পাতায় বন্দি। সিনেমা সংকটের এই নির্মম প্রভাবে অসহায়ভাবে দিন পার করছেন অনেক প্রান্তিক শিল্পী। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে, অনেককে দুবেলা ঠিকমতো খাবার জোটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক শিল্পীকে নামমাত্র পারিশ্রমিকে বিভিন্ন সার্কাস কিংবা ইউটিউব চ্যানেলের ছোটখাটো কনটেন্টে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে রুপালি জগতের এই শূন্যতা ও হাহাকারের মধ্যেও এফডিসির একটি চিত্র কখনই বদলায়নি, তা হলো নির্বাচন। বছরের পর বছর সিনেমা না হলেও, সিনেমাপাড়ায় শিল্পীদের দেখা না মিললেও, সমিতি ঠিকই বহাল তবিয়তে আছে। বিশেষ করে সমিতির নির্বাচন এলেই এফডিসি এলাকা অন্য রূপ ধারণ করে। নির্বাচন এলেই এফডিসিতে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। সিনেমা থাকুক আর না থাকুক, শিল্পী সমিতির নির্বাচন শুরু হওয়া মানেই এফডিসির ভিতরে জমজমাট চায়ের আড্ডা, রঙিন পোস্টার, গানবাজনা আর হরেক রকমের খাওয়াদাওয়ার মহোৎসব। সারা বছর যে এফডিসি নীরব-নিথর থাকে, ভোটের হাওয়া লাগতেই সেখানে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ভোটারদের মন জয়ে চলে নানা আয়োজন। অথচ এই উৎসব শেষ হতেই আবার সেই পুরোনো চেনা নীরবতা ভর করে চলচ্চিত্রপাড়ায়। সাধারণ মানুষের মনে তাই প্রশ্ন জাগে, বছরের পর বছর সিনেমা ছাড়া কেবল এই সমিতি দিয়ে চলচ্চিত্রের কী উন্নয়ন হচ্ছে?
