শ্রীমঙ্গলের গোপলা নদী অবহেলায় মরে যাচ্ছে

দীপংকর ভট্টাচার্য লিটন, শ্রীমঙ্গল

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার একমাত্র নদী গোপলা। আশিদ্রোন, ভূনবীর, মির্জাপুর ও সদর ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা এই নদীটি এখন গতিহারা। বালু আর পলিতে ভরাট হয়ে দিক বদল করেছে এই নদী। মূল নদীর জমি দখল কেউ গড়ে তুলেছেন মাছের খামার, বাসাবাড়ি, কেউ করেছেন ধান চাষ। কেউবা নদী ভরাট করে করেছেন যাতাযাতের রাস্তা। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নদীর জায়গা দখল হতে থাকলেও জমি উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ নেই। একইভাবে ভরাট হয়ে যাওয়া নদী খনন করে পুরোনো গতি পথ ফেরাতেও কোনো প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে না। মরা নদীর দুই পাশের কৃষিজমি এখন পতিত পরে আছে। পানির অভাবে হাওড়ের প্রায় ১১টি বিল বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের পথে রয়েছে আরও দুটি বিল। আর এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় বাস্তবতা থেকে হারিয়ে গিয়ে শুধু মানচিত্রেই থাকবে এই নদীটি। অথচ বর্ষায় এ উপজেলার উজান থেকে নেমে আসা সমস্ত পানি এই নদী দিয়েই প্রবাহিত হয়ে হাইল হাওড়ে গিয়ে পতিত হতো।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে, উপজেলার বিলাশছড়া ও উদনাছড়া মতিগঞ্জ নামক স্থানে এসে একত্রে মিলিত হয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর গোপলা নদী নাম ধারণ করে। এক সময় এ নদী দিয়ে স্ট্রিমার-জাহাজ চলাচল করত। এ অঞ্চলের চা বাগানের ও ব্যবসাবাণিজ্যের মালামাল আসত জাহাজে করে। জাহাজ ভেরানোর জেটির নামানুসারে আজও সদর ইউনিয়নের একটি এলাকার নাম ‘জেটি রোড’ নামে পরিচিত।

সরজমিনে জিলাদপুর ও উত্তর উত্তরসুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রাবারডাম থেকে গোপলা নদী গতিপথ পরিবর্তন করে বিভিন্ন ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গরুরদ্বারা হয়ে পানি হাইল হাওড়ে যাচ্ছে। আর নদীর শেষ অংশ হাওড় থেকে প্রবাহিত হয়ে মনু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আর মূল নদী গতি হারিয়ে প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। নদীর কোথাও শুকনো জমি, কোথাও বা কচুরি পানায় ভরে আছে। আবার কোথাও খালে পানি জমে মরা গোপলা তার অস্থিত্বের জানান দিচ্ছে। কেউ গোপলার বুকে করেছেন ধান চাষ।

এলাকার মানিক সরকার বলেন, ‘প্রায় ত্রিশ বছর আগে এই নদীর গতি পথ বদলে গেছে। নতুন গতিপথের কারণে ভূমি হারানোর শিকার হয়েছেন অনেক জমির মালিক। মরা নদীর দুই পাশের প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি পরে থাকে।’ আরেক ব্যক্তি কবির মিয়া বলেন, ‘রাবারডাম থেকে কালেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার নদী এখন মরা। এ কারণে বিলীন হয়ে গেছে হাওড়ের দিঘালীয়াবিল, রাতারবিল, কুঞ্জবেরী, ঘোড়ামারা, আগুড়া, কুচবিল, চণ্ডীবিল, ছড়াডুবা, ধইলডুবাবিল, পাত্রবেরী ও নাইফতাডুবাবিল। বিলীনের পথে রয়েছে ডুমরবিল ও বাধাইবিল।’ তিনি বলেন, নদীটি খনন করে পুরাতন গতিপথ ফিরিয়ে আনলে বিলগুলো আবার দেশীয় মাছে ভরে উঠতে পারে। মতিগঞ্জ এলাকার বলাল আহম্মেদ জানান, গোপলা নদীর নতুন গতি পথের কারণে তার বারো বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। আর নদীটি বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানা জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে নদীর প্রসস্ত কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘প্রায় পাঁচ কিলোমিটারের মৃত নদীর পুরোনো গতিপথ খনন করলে নদীটি তার নাব্য ফিরে পাবে। নদী প্রসস্ত হবে। এতে শুধু এ এলাকার মানুষই উপকৃত হবেন না, রদশের কৃষি ও মৎস্য খাতেও উৎপাদন বাড়বে।’ মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, ‘গোপলা নদীর গতিপথ বদলের বিষয়টি আমার জানা নেই। আমরা সমীক্ষা করে দেখব কী করা যায়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights