সংকট আতঙ্কে বাসাবাড়িতে তেল মজুত, অগ্নিদুর্ঘটনার আশঙ্কা

শামীম আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। তবে বাস্তবে জ্বালানি ঘাটতির তেমন সংকট না থাকলেও আতঙ্কে কিংবা বেশি দামে বিক্রির আশায় অনেকেই অবৈধভাবে অকটেন ও ডিজেল মজুত করছেন। উদ্বেগজনকভাবে, এই মজুত এখন বাসাবাড়িতেও ছড়িয়ে পড়েছে- যেন প্রতিটি ঘরই পরিণত হয়েছে ছোট একটি পেট্রোলপাম্পে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই বাসায় ২ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল জমা করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খোলামেলা অকটেন বিক্রির পোস্ট দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রতি লিটার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে- যা স্বাভাবিক দামের প্রায় দ্বিগুণ।

প্রশাসনের তথ্যমতে, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার অকটেন উদ্ধার করা হয়। এরপরও প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অবৈধভাবে মজুত বা বিক্রির ঘটনা সামনে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসাবাড়িতে এমন দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ মারাত্মক বিপজ্জনক। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, এগুলো বাসায় মজুত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পেট্রোল-অকটেন এগুলো মূলত হাইড্রোকার্বন এবং খুবই উচ্চ দাহ্য। এগুলো উদ্বায়ী পদার্থ। এই বৈশিষ্ট্যের ফলে এটি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফ্লাস পয়েন্ট অত্যন্ত কম (৫৫.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট/১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) হওয়ায় কক্ষ তাপমাত্রায় যেকোনো আগুনের উৎস পেলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হলে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে। সুতরাং এটি অনিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্বল্প সময়ে দ্রুত অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ ধরনের অকটেন বা পেট্রোল মজুত করা হতে সবাইকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান করছি। এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক ড. মো. রবিউল আউয়াল জানান, মার্চ থেকে মে মাসে দেশে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি থাকে, বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে। এ সময়ে যদি কোনো বাড়িতে দাহ্য জ্বালানি মজুত থাকে এবং বজ্রপাত ঘটে, তাহলে তা ভয়াবহ বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে। আশপাশের বাড়িঘরেও সেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার বজ্রপাত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ মাটিতে আঘাত হানে। এতে বছরে প্রায় ৩৫০ জন প্রাণ হারান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসাবাড়িতে জ্বালানির মজুত শুধু অগ্নিঝুঁকিই নয়, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বন্ধ বা কম বায়ু চলাচলের জায়গায় অকটেন বা ডিজেলের বাষ্প জমে সহজেই বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করে। দীর্ঘ সময় এসব বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, চোখ ও ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। শিশু ও প্রবীণদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। তা ছাড়া জ্বালানি লিক হয়ে মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ ঘটাতে পারে। আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া জ্বালানি তেল মজুত বা খোলাবাজারে বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রমাণ পাওয়া গেলে জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

তবুও আতঙ্কের কারণে অনেকেই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছেন। গতকাল রাজধানীর একটি পেট্রোলপাম্পে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শতাধিক মানুষ। অনেকেই জানান, ‘ভবিষ্যৎ বিপদ’ মোকাবিলায় বাসায় কিছু তেল বোতলে মজুত করে রেখেছেন। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৪ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আগামী দুই মাসে কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক থেকে জ্বালানি মজুত কোনো সমাধান নয়; বরং এটি ব্যক্তি ও জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। কোনো ভবনের একাধিক ফ্ল্যাটে যদি জ্বালানির মজুত থাকে, সেখান থেকে একটি ফ্ল্যাটে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে পুরো বিল্ডিং বিস্ফোরিত হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights