সংস্কারে পাশে জাতিসংঘ

নিজস্ব প্রতিবেদক
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গতকাল জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস -পিআইডি
বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা হ্রাসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গতকাল তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে তিনি এসব কথা জানান।

অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, আমি সংস্কার কর্মসূচির প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করতে চাই। আমরা আপনাদের সংস্কার প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিতে এখানে এসেছি। আমরা সর্বোত্তম সফলতা কামনা করি। সংস্কারের জন্য আমরা কী করতে পারি, তা জানান।

তিনি বলেন, আমি জানি সংস্কার প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে। তবে আশা করি, সংস্কারগুলো বাংলাদেশকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে নিয়ে যাবে এবং দেশের একটি বাস্তব পরিবর্তন আনবে। এর মাধ্যমে গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল তার প্রতিফলন ঘটবে। জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে ও তাদের পাশে দাঁড়াতে এখানে এসেছি। আমি কখনো এমন একটি জনগণকে এত বেশি বৈষম্য সহ্য করতে দেখিনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের ভুলে গেছে। সহায়তা কমে যাওয়া একটি অপরাধ। পশ্চিমা দেশগুলো এখন প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্র দ্বিগুণ করেছে, কিন্তু মানবিক সহায়তা সারা পৃথিবীতে কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশের প্রতি অভূতপূর্ব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা জনগণের প্রতি অত্যন্ত দানশীল হয়েছে। এ সময় অধ্যাপক ইউনূস জাতিসংঘ মহাসচিবকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সফর করার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আপনার আসার জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারত না। আপনার সফর কেবল রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও সময়োপযোগী। গুতেরেসকে সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ১০টি রাজনৈতিক দল তাদের মতামত জমা দিয়েছে। দলগুলো ছয়টি কমিশনের সুপারিশসমূহের সঙ্গে একমত হলে, তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পাশাপাশি রাজনৈতিক, বিচারিক, নির্বাচনসংক্রান্ত, প্রশাসনিক, দুর্নীতি দমন এবং পুলিশ সংস্কারের একটি রূপরেখা হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি ‘সংক্ষিপ্ত সংস্কার প্যাকেজ’ নিয়ে একমত হয়, তবে নির্বাচন ডিসেম্বরেই হতে পারে। তবে তারা যদি ‘বৃহৎ সংস্কার প্যাকেজ’ গ্রহণ করে, তাহলে নির্বাচন আগামী বছরের জুনে অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

রোহিঙ্গাদের সম্মানের সঙ্গে তাদের মাতৃভূমি রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘ মহাসচিবের সহযোগিতা চান। তিনি বলেন, যতদিন তারা বাংলাদেশে অবস্থান করছে ততদিন পর্যন্ত তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও মানবিক সহায়তা যেন নিশ্চিত করা যায়। আমরা রোহিঙ্গাদের দুর্দশার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছি। বিশ্বকে জানতে হবে তারা কতটা কষ্ট পাচ্ছে। তাদের মধ্যে একটা হতাশার অনুভূতি রয়েছে। জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং তাদের জন্য সহায়তা সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেবেন। বৈঠকে ভূ-রাজনীতি, সার্কের বর্তমান অবস্থা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্কের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। অধ্যাপক ইউনূস দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ফোরামকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তার প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য হতে চায়। প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে একাধিক বন্দর নির্মাণ প্রকল্প সম্পর্কেও কথা বলেন, যা নেপাল ও ভুটানসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে দেশকে ‘একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। বৈঠকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলিসংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ড. খলিলুর রহমান এবং এসডিজিবিষয়ক সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা ও বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গুইন লুইস উপস্থিত ছিলেন। এর আগে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা ইস্যু ও অগ্রাধিকারবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি খলিলুর রহমান।

কক্সবাজারে লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইউনূস-গুতেরেসের ইফতার : কক্সবাজারে লাখো রোহিঙ্গার সঙ্গে ইফতার করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। গতকাল উখিয়ার ২০ নম্বর ক্যাম্পে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে এ ইফতারের আয়োজন করা হয়। ইফতার মাহফিলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরাতে প্রয়োজনে সারা দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করব। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহযোগিতা বাড়াতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

দেশে ফেরাতে সারা দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করব-প্রধান উপদেষ্টা : প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে প্রয়োজনে সারা দুনিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে হবে। ঈদে মানুষ আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করে। রোহিঙ্গাদের সেই সুযোগও নেই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের দুঃখ দেখে সমাধান করতে জাতিসংঘ মহাসচিব এসেছেন। এই ঈদে না হোক আগামী ঈদে যাতে রোহিঙ্গারা নিজের দেশে ঈদ করতে পারেন সেই প্রত্যাশা করি।’

খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে রোহিঙ্গারা-গুতেরেস : জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গারা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।’ উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

গুতেরেস বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে আমি দুইটি স্পষ্ট বার্তা পেয়েছি। প্রথমত, আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গারা আরও ভালো পরিবেশ চায় ক্যাম্পে।’

এর আগে দুপুরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের কথা শোনেন এবং ক্যাম্পের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘের মহাসচিব বেলা ২টা ১০ মিনিটের দিকে রোাহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছেন।

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করার সময় ধান ভানলেন গুতেরেস। এ ছাড়া ক্যাম্পে তিনি রোহিঙ্গাদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পণ্য পরিদর্শন করেন। এ সময় জাতিসংঘ মহাসচিবকে রোহিঙ্গা ঐতিহ্যের ধারক ‘ধান ডলনি’ চালনা করতে দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights