সংস্কারের নামে পুকুরের সর্বনাশ

কাজী শাহেদ, রাজশাহী
রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের দুটি পুকুর। পুকুর দুটি সংস্কার কাজ করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। লক্ষণীয় হলো, এর জন্য বক্ষব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম অনুমতি নেয়নি রাসিক! শুধু পুকুর দুটি আর ইজারা না দিতে চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে বিশালাকৃতির পুকুর দুটি পরিণত হয়েছে চৌবাচ্চায়। শুধু বক্ষব্যাধি হাসপাতালের পুকুরই নয়, নগরীর ৯টি পুকুর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সংস্কার শুরু করে রাসিক। এদিকে, রাসিকের আরিফুল হক পরাগ নামে একজন প্রকৌশলী জানান, আগের মেয়রের সময় প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে। সংস্কার কাজ অনেকটা শেষের পথে। এখন নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। কাজের মান যাতে ভালো হয়, সেদিকটি তদারকি করছি।

প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী মহানগরীর আটটি পুকুর খনন, উন্নয়ন ও সংস্কার নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ। নগরবাসীর অভিযোগ, খনন ও সৌন্দর্য বর্ধনের নামে বড় পুকুরগুলো ভরাট করে বানানো হচ্ছে চৌবাচ্চা বা সরু নালা। জানা গেছে, রাসিক যেসব পুকুর খনন ও সংস্কার করছে সেগুলোর মালিক বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি। অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্টদের অনুমতি বা কোনো সমঝোতা ছাড়াই উন্নয়নের নামে পুকুরগুলোর একেকটিকে পরিণত করা হচ্ছে বিনোদন পার্কে।

জানা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় মহানগরীর বড় পুকুর খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে ৯টি বড় পুকুর খননের দরপত্র আহ্বান করা হয়। খনন কাজের দরপত্র পায় সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ মুন এন্টারপ্রাইজসহ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের অধীন রয়েছে আটটি জলাশয় ও পুকুর। ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি পুকুর খননসহ সংস্কারের কাজ পায় মুন এন্টারপ্রাইজ। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে বিলও পেয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি । তবে বাস্তবে মুন শুধু বুলনপুর ঈদগাহের পশ্চিম পাশের পুকুরটির কাজ শেষ করতে পেরেছে। বাকি দুটি পুকুরের কোনো কাজই হয়নি। দরপত্র ছাড়াই মুনকে দিয়ে করানো হচ্ছে হাজী মুহসিন স্কুলের পুকুর উন্নয়নের কাজ। দরপত্র ছাড়াই কীভাবে কাজ করছেন, জানতে চাইলে মুন এন্টারপ্রাইজের মালিক ফিরোজ কবির বলেন, এটি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। তাকে যেখানে কাজ করতে বলা হয়েছে তিনি সেখানে করছেন।
নগরীর পবা নতুনপাড়ার একটি পুকুরের কাজ পেয়েছেন খালেক নামে এক ঠিকাদার। ব্রিটিশ আমলের পুকুরটির মালিক আলী আশরাফ ও তার ভাইয়েরা। বিশাল এই পুকুরটি খননের বদলে চারপাশ উঁচু করে ভরাট করা হয়েছে। এটি এখন সরু ডোবায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুর খুঁড়ে আরও গভীর ও বড় করার কথা ছিল। অথচ ভরাট করে বিনোদন স্পট বানানো হয়েছে। পুকুরে আগে গভীর পানি ছিল। এলাকার মানুষ গোসলসহ এটির পানি ব্যবহার করতেন যা এখন সম্ভব না। পুকুরের মালিক আশরাফ আলী বলেন, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহিদুল ইসলামের কাছে ওয়ারিশান সনদ নিতে গেলে ২ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় করপোরেশনকে দিয়ে পুকুরটি দখল করিয়ে বিনোদন পার্ক বানাচ্ছে।

নগরীর লক্ষ্মীপুর বক্ষব্যাধি ও শিশু হাসপাতালের জোড়া পুকুরের মালিক স্বাস্থ্য বিভাগ। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই পুকুর দখলে নিয়ে কাজ শুরু করে রাসিক। ইতোমধ্যে পুকুরটির চারপাশ ভরাট করে সরু লেক করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মজিবুর রহমান বলেন, ‘অনুমতি ছাড়াই রাসিক কাজ করছে। তারা বলেছিল শুধু পাড় বাঁধাবে। খনন করবে। কিন্তু আশি ভাগ ভরাট করে সরু লেক করা হচ্ছে।’ বুলনপুর ঈদগাহের পশ্চিমের পুকুর খনন ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শেষ। এটিকেও উন্নয়নের নামে ভরাট করে সরু নালায় পরিণত করা হয়েছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights