সংস্কৃতিও যখন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার

অনলাইন ডেস্ক

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সংস্কৃতিকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখে না। শি চিনপিংয়ের নতুন সাংস্কৃতিক তত্ত্বের লক্ষ্য প্রচার, গণমাধ্যম, সাহিত্য, শিল্পকলা, ধর্ম ও ইন্টারনেটের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ আরও প্রাতিষ্ঠানিক করা। এতে জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হলেও স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রশ্ন উঠছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বরাবরই সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এরই নতুন উদাহরণ পাওয়া গেছে গত ১২ অক্টোবর দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পিপলস ডেইলিতে প্রকাশিত একটি তাত্ত্বিক নিবন্ধে। এতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারাকে দলীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক্সবাদ স্কুলের অধ্যাপক সান লাইবিনের লেখা নিবন্ধটিতে সদ্য প্রকাশিত *শি চিনপিং কালচারাল অ্যান্থলজি*র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের কথা বলা হয়েছে। সংকলনটিকে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং প্রচার, মতাদর্শ ও সংস্কৃতির ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার ব্যবহারিক নির্দেশিকা হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

নিবন্ধটির মূল বক্তব্য হলো, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে ভূমিকা রাখতে হবে। মতাদর্শিক সামঞ্জস্যকে জাতীয় স্থিতিশীলতা এবং চীনের পুনর্জাগরণের জন্য অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

সান লাইবিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পার্টির ভবিষ্যৎ, দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় সংহতির প্রশ্ন জড়িত। সংকলনটির ৭৮টি লেখাকে শি চিনপিংয়ের তাত্ত্বিক কর্তৃত্ব ও চীনের ‘সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের’ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এর আড়ালে রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা—কোন চিন্তা তৈরি হবে, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়বে এবং কোন মতের সঙ্গে বিতর্ক করা যাবে, তার সীমা নির্ধারণের অধিকার পার্টির হাতে থাকবে।

সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্ব
মতাদর্শের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই ধারণা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য নতুন নয়। লেনিনবাদী ঐতিহ্য অনুসারেই দলটি রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এসেছে। তবে শি চিনপিংয়ের আমলে এই নীতিকে আরও বিস্তৃত ও সুসংহত মতবাদে পরিণত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

এই কাঠামোর আওতায় শুধু গণমাধ্যম নয়, সাহিত্য, শিল্পকলা, ধর্ম ও ইন্টারনেটও রয়েছে। সান লাইবিন পার্টির নেতৃত্বকে ‘সামগ্রিক ও সর্বব্যাপী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার আওতা সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্র ও কর্মকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই মতাদর্শের ভিত্তি মার্ক্সবাদী তত্ত্ব। এর একটি মূল ধারণা হলো, সমাজে প্রভাবশালী চিন্তা অনেকাংশে প্রভাবশালী বস্তুগত সম্পর্কের প্রতিফলন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ব্যাখ্যায়, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি মানুষের চিন্তা ও জনমতের ওপরও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক নীতির লক্ষ্য শুধু সরকারি বক্তব্য প্রচার করা নয়; বরং কোন ধারণাকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে এবং জাতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞা কী হবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব পার্টির হাতে রাখা।

গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটে নিয়ন্ত্রণের দর্শন
এই নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায় গণমাধ্যম ও ডিজিটাল পরিসরের ক্ষেত্রে। সান লাইবিনের নিবন্ধে ‘সঠিক জনমত পরিচালনা’কে পার্টি ও জনগণের স্বার্থের সহায়ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিপরীতে, ভুল জনমত পরিচালনাকে উভয়ের জন্য ক্ষতিকর বলা হয়েছে।

ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও সেটিকে ‘সঠিকভাবে পরিচালনা ও ব্যবহার’ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই আসল সত্য’—এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এখানে তথ্য নিয়ন্ত্রণকে কোনো সাময়িক সংকট মোকাবিলার ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার স্থায়ী উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিবন্ধটিতে পার্টির শৃঙ্খলা ও জনগণের অংশগ্রহণের মধ্যে সামঞ্জস্যের কথাও বলা হয়েছে। ‘পার্টির বৈশিষ্ট্য’ ও ‘জনগণের বৈশিষ্ট্য’কে অভিন্ন এবং পরস্পরবিরোধী নয় বলে দাবি করা হয়েছে। এর অর্থ, পার্টির রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং জনগণের স্বার্থ শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় মিলিত হয়—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।

তবে এ ব্যাখ্যায় এমন সম্ভাবনার জন্য খুব কম জায়গা থাকে, যেখানে নাগরিকদের বৈধ দাবি বা সাংস্কৃতিক পছন্দ সরকারি অগ্রাধিকারের সঙ্গে না-ও মিলতে পারে।

জাতীয় নিরাপত্তা, ঐক্য ও সৃজনশীলতার প্রশ্ন
চীনের এই মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পেছনে কৌশলগত বিবেচনাও রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বিদেশি সমালোচনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় বেইজিং অভ্যন্তরীণ জনমত ও বয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় স্থিতিস্থাপকতার অংশ হিসেবে দেখছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রাজনৈতিক আনুগত্যকে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, মতাদর্শিক ভিন্নমতকে সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগও তৈরি হয়।

তবে এই ব্যবস্থার মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে চিন্তার স্বাধীনতা এবং সৃজনশীল পরীক্ষানিরীক্ষার ক্ষেত্র সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হলেও তার জন্য রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত সীমারেখা রয়েছে। সমালোচনার সুযোগ থাকলেও কোন বিতর্ক গ্রহণযোগ্য আর কোনটি মতাদর্শিক বিশৃঙ্খলা—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃত্ব পার্টির হাতেই থাকছে।

সব মিলিয়ে, শি চিনপিং কালচারাল অ্যান্থলজি শুধু তাঁর বক্তব্যের সংকলন নয়; বরং মতাদর্শিক নেতৃত্বকে দীর্ঘস্থায়ী শাসনব্যবস্থার অংশে পরিণত করার একটি প্রচেষ্টা। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক ঐক্য জাতীয় শক্তির উৎস। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ঐক্য কি সত্যিকার আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা তৈরি করতে পারবে, নাকি মতাদর্শিক আনুগত্যের দাবি শেষ পর্যন্ত চীনের সংস্কৃতির বিকাশের পরিসরকেই সংকুচিত করবে?

সূত্র: ডেইলি মিরর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights