সচ্ছল হয়েও দরিদ্র: খাদ্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দামে বিপাকে ইরানিরা
অনলাইন ডেস্ক
ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলের ফাদাইয়ান-ই ইসলাম সড়ক। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী এক প্যাকেট চাল হাতে নিয়ে দামটি গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। কিছুক্ষণ পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেটি রেখে চলে গেলেন তিনি।
“দশকের পর দশক ধরে মূল্যস্ফীতি আমাদের পরিবারের আয়কে চাপে ফেলেছে। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি যেন আমাদের খাবারের টেবিলটাই প্রায় কেড়ে নিচ্ছে,” বললেন ওই নারী। তিনি আরও বলেন, “সব ধরনের পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে।”
ইরানে এখন এমন দৃশ্য খুবই পরিচিত। নৌ অবরোধ, পরপর দুটি যুদ্ধ এবং জাতীয় মুদ্রার মূল্যমানের বড় ধরনের পতনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ইরানি ক্যালেন্ডারের তির মাসে- ২১ জুন থেকে ২০ জুলাই- গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৮ শতাংশে।
দ্রুতগতির এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজার করা অনেক ইরানির কাছেই এখন যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। দেশের প্রধান ১০টি খাদ্যপণ্য শ্রেণির মধ্যে আটটির মূল্যস্ফীতি ১০০ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
বেতন দিয়ে শুধু খাবারই কেনা যাচ্ছে না
শিলা নামের এক নারী বলেন, “এক বছর আগেও পুরো মাসের সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমার পুরো বেতন দিয়ে কিনতে পারতাম। আজ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির পরও সেই বেতন দিয়ে শুধু খাবারের খরচই মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিন সন্তানের মা শিলা ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন এবং শিগগিরই অবসরে যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, “খাদ্যপণ্যের দাম কয়েক দফায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এখন আর বুঝতে পারি না কী রান্না করব। প্রতিবার বাজার থেকে ফেরার সময় দেখি, আগের তুলনায় কম জিনিস নিয়ে ফিরছি।”
ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রায় এই পরিবর্তন বিশেষভাবে দৃশ্যমান। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল। কিন্তু এখন তাদের অনেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কিনতেও হিসাব কষতে বাধ্য হচ্ছেন।
এটি মজার কৌতুক নয়, তিক্ত ট্র্যাজেডি
একই সড়কে একটি বড় মুদি দোকান থেকে কয়েকটি প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে আসছিলেন ৪৫ বছর বয়সী মাজিয়ার। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তিনি।
ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “ব্যাগের সংখ্যা বা আকার দেখে বিচার করবেন না। আমরা লাল মাংস, ভালো মানের ইরানি চাল এবং উন্নতমানের তেল কেনা ছেড়ে দিয়েছি। অথচ এগুলো একসময় আমাদের খাবারের টেবিলের নিয়মিত অংশ ছিল।”
মাজিয়ার বলেন, “বেতন হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিস, বিশেষ করে খাদ্যপণ্য কিনতে ছুটে যাই। কারণ ভয় হয়, পরদিনই হয়তো দাম আরও বেড়ে যাবে।”
এরপর কিছুটা ক্লান্ত হাসি দিয়ে তিনি বলেন, “শুনতে হয়তো মজার কৌতুকের মতো লাগতে পারে, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটি একটি তিক্ত ট্র্যাজেডি।”
তেহরানের শুধু দক্ষিণাঞ্চলেই নয়, রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের তুলনামূলক সচ্ছল এলাকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ধনী ক্রেতারাও এখন শুধু দাম জানতে আসেন
তেহরানের উত্তরের তাজরিশ স্কয়ার এলাকায় মুদি দোকানিরাও পণ্যের দাম ও মুদ্রার বিনিময় হারের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
৬৩ বছর বয়সী মুদি দোকানি মাহমুদ বলেন, “প্রতিদিনই দাম পরিবর্তন হচ্ছে। সকালে দোকান খোলার পর দেখি, কয়েক দিন আগের তুলনায় পাইকারি দাম বেড়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “আমার অধিকাংশ ক্রেতাই সচ্ছল। কিন্তু এখন তারা দোকানে এসে শুধু দাম জিজ্ঞেস করেন। আগের বছরগুলোতে দাম যতই হোক, তারা প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেন।”
এমনকি কিছু ক্রেতা এখন বাকিতে পণ্য দেওয়ার অনুরোধও করছেন বলে জানান তিনি।
তবে মাহমুদের প্রশ্ন, “আমি কীভাবে বাকিতে পণ্য বিক্রি করব, যখন আমি নিজেই জানি না আগামীকাল দাম কত হবে?”
৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছেন মাহমুদ। তার ভাষায়, “আমি কখনও এমন পরিস্থিতি দেখিনি। এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও- ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত- বাজারে প্রতিদিন ন্যূনতম কেনাকাটার কার্যক্রম বজায় ছিল। কিন্তু আজ বাজার যেন একেবারে ক্লিনিক্যাল ডেথ বা মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছে গেছে।”
যুদ্ধের চাপেও অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি
ইরানের কোটি কোটি মানুষ এখন জীবিকা ও টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে পাঁচ মাসের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরও দেশটির অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি ধসে পড়েনি।
৯ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের এই বিশাল ও প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রফতানিকারক। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলায় ইরান অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়ে এসেছে।
এর ফলে তেলনির্ভর অর্থনীতির পাশাপাশি দেশটিতে তুলনামূলক বৈচিত্র্যময় অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোও গড়ে উঠেছে।
তবে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য বলছে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব এখন প্রায় সব ধরনের পণ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে।
তেল ও চর্বিজাতীয় পণ্যে মূল্যস্ফীতি ২৬১ শতাংশ
মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় সবচেয়ে ওপরে রয়েছে রান্নার তেল ও চর্বিজাতীয় পণ্য। এসব পণ্যের এক বছরের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬১ দশমিক ৫ শতাংশে।
ইরানে অধিকাংশ পরিবারই রান্নায় তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের খাবারের টেবিলে।
এর পরেই রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য- বিশেষ করে দুধ ও পনির। এসব পণ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১৪৭ দশমিক ১ শতাংশ।
লাল ও সাদা মাংস এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১৪৫ দশমিক ২ শতাংশে।
এমনকি দরিদ্র মানুষের প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত রুটি ও শস্যও মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে রেহাই পায়নি। রুটি ও শস্যজাতীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ১১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
অর্থাৎ, ইরানের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য খাবারের সবচেয়ে মৌলিক উপকরণগুলোও এখন আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
বেসরকারি চাকরিজীবীরাও চাপে
যুদ্ধ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব ইরানের সমাজের প্রায় সব স্তরেই পড়েছে। এমনকি তুলনামূলক ভালো বেতনের বেসরকারি খাতের কর্মীরাও এখন জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে পারছেন না।
৩৪ বছর বয়সী স্থপতি মরিয়ম তেহরানের একটি বাজারে ফল ও সবজি কিনছিলেন। তিনি বলেন, “দুই বছর আগে বাজারে গেলে চিন্তা না করেই ট্রলি ভরে ফেলতাম।”
“আজ প্রতিটি রিয়াল গুনে খরচ করতে হয়। আমি ও আমার স্বামী দু’জনই বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। তারপরও আমরা আর আগের মতো জীবনযাপন করতে পারছি না,” বলেন তিনি।
মরিয়ম জানান, তেহরানে দারিদ্র্যসীমা বেড়ে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন রিয়ালে পৌঁছেছে, যা ৬৫৪ ডলারের কিছু বেশি।
তিনি বলেন, “এর অর্থ হলো, আমরাও খুব শিগগিরই এই ভয়ংকর সীমার নিচে নেমে যেতে পারি। মাত্র দুই বছর আগেও আমরা উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে ছিলাম। কিন্তু আজ আমরা হয়ে গেছি ‘সচ্ছল হয়েও দরিদ্র’- দ্য ওয়েলথি পুওর।”
সচ্ছল হয়েও দরিদ্র-বদলে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের জীবন
ইরানে বর্তমান সংকটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো- মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। একসময় যেসব মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার নিজেদের স্বচ্ছল মনে করত, তারাও এখন খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
যুদ্ধ, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকট মিলিয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে একই বেতন দিয়ে আগের মতো পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
বাজারে ক্রেতারা কম পণ্য কিনছেন, ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ দামের নিশ্চয়তা না থাকায় বাকিতে বিক্রি করতে ভয় পাচ্ছেন এবং পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় খাবারের তালিকা ছোট করে আনছে।
ইরানের অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সংকটের গভীরতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি যদি এই গতিতে অব্যাহত থাকে, তাহলে মধ্যবিত্তের আরও বড় একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার দিকে ঠেলে পড়তে পারে।
তেহরানের বাজারের অভিজ্ঞতা তাই শুধু পণ্যের দাম বাড়ার গল্প নয়; এটি ইরানের একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান দ্রুত বদলে যাওয়ার চিত্র- যেখানে একসময় স্বচ্ছল পরিবারও এখন প্রতিটি রিয়াল খরচের আগে হিসাব করতে বাধ্য হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা
