সজারুটির এলাকার লোকজনের সঙ্গে দারুণ শখ্য গড়ে

মো. নাসির উদ্দিন, টাঙ্গাইল
মানুষ ও প্রাণীর ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সন্ধানপুর ইউনিয়নের কুশারিয়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন মিয়া। পেশায় তিনি একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক। তার অকৃত্রিম ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী সজারু পোষ মেনেছে। কুড়িয়ে পাওয়া বন্য সজারুটির এলাকার লোকজনের সঙ্গে দারুণ শখ্য গড়ে উঠেছে। প্রাণীটি দিন-রাত লোকালয়ে ইচ্ছামতো ঘুরে বাড়ির এদিক-সেদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। প্রায় ১১ মাস আগে রাতে ঘাটাইল-সাগরদিঘি স্থানীয় সড়কে কুড়িয়ে পেয়ে কুশারিয়ায় নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন সজারুটি। ছানাটিকে পরম যত্নে লালন-পালন করছেন তিনি। ভালোবাসা পেয়ে বর্তমানে প্রাণীটি অবিশ্বাস্য পোষ মেনে পরিবারের সদস্যের মতো বসবাস করছে। ঘাটাইলের সন্ধানপুর ইউনিয়নের কুশারিয়া গ্রামে লিটনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির এপার-ওপার দৌড়ে বেড়াচ্ছে সজারুর ছানা। কেউ চলার পথে বাধা দিলে পুরো শরীরের কাঁটাগুলো মেলে ধরছে। আদরে গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে আনন্দ পাচ্ছে। প্রতিদিন দুপুর ও বিকালে গর্ত থেকে বেরিয়ে বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রাণীটি দেখতে উৎসুক জনতা লিটনের বাড়িতে ভিড় করছে। কুড়িয়ে পাওয়া বন্য সজারু ছানাটির নাম রেখেছেন ‘পাগলা’।

লিটন মিয়া বলেন, ‘পাগলা’ বলে ডাক দিলে সজারুটি খাবারের জন্য ছুটে আসে। পেছন পেছন যেতে বললে সে পোষা অন্য প্রাণীর মতো সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে। পোষমানা সজারু ‘পাগলা’ সাধারণত কলা, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পাউরুটি, ভাত, দুধ, বিস্কুট ইত্যাদি খেতে বেশি পছন্দ করে। তিনি জানান, প্রায় ১১ মাস আগে একটা কলাবাগানে ভেজা অবস্থায় ছিল সজারুটি। বয়স সম্ভবত দুই-চার দিন হবে।’ ছানাটিকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা সবাই মিলে পরিচর্যার মাধ্যমে অসুস্থ সজারু ছানাটিকে পরম যত্নে সুস্থ করে তোলা হয়। এরপর থেকে সজারু ছানাটি পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আনন্দে তাদের সঙ্গে বসবাস করছে। ঘরের ভিতর খড় দিয়ে থাকা ও ঘুমানোর জন্য জায়গা তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সজারু ছানাটি সেখানে না ঘুমিয়ে ঘরের বাইরে একটা জায়গায় মাটির নিচে নিজেই সুড়ঙ্গ তৈরি করে সুন্দরভাবে বসবাস করছে। ওই গ্রামের সাগর আহমেদ জানান, এ প্রাণী তো লোকালয়ে মানুষের কাছে পোষ মানার কথা নয়। এগুলো সাধারণত পাহাড়ে গর্তে লুকিয়ে থাকে। লিটনের পরিবারে প্রাণীটি প্রাকৃতিক উপায়ে পোষ মানার বিষয়টি তাকে চরম মুগ্ধ করেছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে সজারুর সংখ্যা এক সময় বেশ ছিল, তবে বর্তমানে অবস্থা বিপন্ন। সজারু বাদামি, ছাই কিংবা সাদা বা মিশ্র রঙের হয়ে থাকে। শরীরে ১৪ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত কাঁটা থাকে এবং ওজন ১০ থেকে ১৮ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সজারু একটি সংরক্ষিত প্রজাতি এবং এর শিকার বা হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সজারু একদিকে হিংস্র ও অন্যদিকে ভীতু একটি প্রাণী। মানুষ বা বনের অন্য প্রাণীদের ভীষণ ভয় পায়। অত্যন্ত ছোট অবস্থায় পেয়ে আদর-যত্ন পাওয়ায় ওটা পোষ মেনে থাকতে পারে। টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডক্টর আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, সজারু একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সজারু সংরক্ষিত প্রজাতি। তিনি অটোরিকশা চালকের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে সজারুটিকে এনে বনে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights