সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ি দুর্ভোগ চরমে
রফিকুল ইসলাম রনি
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা। অথচ রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সেবা সংস্থাগুলোর অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি এবং চরম সমন্বয়হীনতার কারণে সেই উন্নয়নই এখন সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাত মাস আগে রাস্তা কেটে রেখেছে সিটি করপোরেশন। এখন সেই রাস্তা আবার কাটছে ওয়াসা। মানুষের চলাচলে চরম সমস্যা হচ্ছে। ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন মিরবাগ এলাকার বিসমিল্লাহ ফার্মেসির মালিক নিজাম উদ্দীন। শুধু মিরবাগ নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট মেরামত, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং ইন্টারনেট লাইনের কাজের নামে চলছে যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি। এক সংস্থার কাজের সমাপ্তি না হতেই অন্য সংস্থা এসে নতুন রাস্তা কাটায় একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে শহরবাসীর জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরবাগ, মধুবাগ, রামপুরা, নতুন রাস্তা, মিরেরটেকসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছয়-সাত মাস ধরে রাস্তা কেটে রাখা হয়েছে। রাস্তায় যান চলাচল তো দূরে থাক মানুষের হেঁটে চলাই কষ্টকর। ইট, সুরকি, খোয়া ফেলে রাখায় আবার ছোট-বড় গর্ত থাকায় চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন এলাকার মানুষ। এর সমাধান কবে তা কেউ জানে না। মিরেরটেকের বাসিন্দা রবিন জানান, প্রায় সাত আট মাস হলো সিটি করপোরেশন রাস্তা কেটে রেখেছে। গাড়ি নিয়ে চলতে পারি না। হাতিরঝিলে এক গ্যারেজে গাড়ি রাখতে হয়। অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি শুধু মধুবাগ, মিরবাগ, মগবাজারে সীমাবদ্ধ নয়, রাজধানীর সব জায়গায় এমন চিত্র চোখে পড়ে।
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত ধানমন্ডি এবং এর সংলগ্ন কলাবাগান এলাকার অলিগলিতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে উন্নয়ন কাজের নামে চলা নৈরাজ্যের চিত্র। কয়েক মাস ধরে এলাকার ভিতরের অনেক রিকশাস্ট্যান্ড ও আবাসিক সড়কের মাঝখানে পাইপ বসানোর কাজ চলছে। রাস্তার একপাশ কেটে মাটি স্তূপ করে রাখায় বাকি অংশ দিয়ে একটি গাড়ি বা রিকশা চলাচল করতে পারছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুল-কলেজ ছুটির সময় এই গলিগুলোর শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকদের চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ধানমন্ডি ২৭ নম্বর ও ৬ নম্বর রোডের সংযোগস্থলগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে তৈরি হওয়া বড় বড় গর্তে প্রায়ই রিকশা উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা বা শুষ্ক মৌসুম-সব সময়েই কোনো না কোনো লাইন মেরামতের নামে রাস্তা খোঁড়া হয়, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা থাকে না। উত্তরা ও মিরপুর এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু করে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া এবং রোকেয়া সরণির বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বিভিন্ন সেবা সংস্থার ভূগর্ভস্থ লাইন স্থাপনের কাজ। মেট্রোরেলের সুফল কিছুটা মিললেও ভূগর্ভস্থ বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইনের কাজের কারণে রাস্তার দুই পাশের ফুটপাত ও মূল সড়কের একাংশ সবসময় অবরুদ্ধ থাকে।
একইভাবে উত্তরার সেক্টরগুলোর ভিতরের সড়কগুলোতে ওয়াসার পানি ও ড্রেনেজ লাইন সংস্কারের কাজ চলছে মাসের পর মাস।
ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা জানান, রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় সামান্য ট্রাফিক সিগন্যালেই দীর্ঘ গাড়ির লাইন জমে যায়, যা পুরো এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে।
পূর্ব ও মধ্য ঢাকার জনবহুল এলাকা মালিবাগ এবং খিলগাঁওয়ের অবস্থা আরও করুণ। এ এলাকার বাণিজ্যিক ও আবাসিক সংযোগ সড়কগুলোতে সুপেয় পানি ও গ্যাস সংযোগের জন্য বারবার রাস্তা কাটা হয়েছে। সম্প্রতি নতুন কার্পেটিং করা পিচঢালা সড়ক কাটার দৃশ্যও দেখা গেছে রামপুরা টিভি সেন্টারসংলগ্ন অলিগলিতে।
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি সংস্থা রাস্তা করে যাওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ পর অন্য একটি সংস্থা এসে কেবল তার বা ক্যাবল টানার জন্য সেই নতুন রাস্তা খুঁড়ে ফেলে। এতে কাজের যেমন মান নষ্ট হয়, তেমনি বর্ষার সময়ে এসব খোঁড়া অংশ কাদায় একাকার হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। রিকশাচালক ও সিএনজিচালকরা জানান, খারাপ রাস্তার কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশ
দ্রুত নষ্ট হচ্ছে এবং আয় কমে গেছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। কেউ গাফিলতি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
