সাগরে লাশ ভাসানোর নির্মম কাহিনি

জাকারিয়া চৌধুরী, হবিগঞ্জ

স্বপ্ন ছিল লিবিয়া হয়ে পাড়ি দেবেন স্বপ্নের ইউরোপে। সেখানে গিয়ে রোজগার করবেন লাখ লাখ টাকা, অভাব ঘোচাবেন পরিবারের। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর কখনোই পূরণ হবে না হবিগঞ্জের লুৎফুর রহমান ও জুনাইদ মিয়ার। ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা হলো ঠিকই, কিন্তু সেই যাত্রাই ছিল তাদের জীবনের শেষযাত্রা। ভূমধ্যসাগরেই যেন ডুবে গেল সব স্বপ্ন। মৃত্যুর পর সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় তাদের লাশ। মূলত খাবার আর পানির অভাবে নৌকাতেই মৃত্যু হয় তাদের। লুৎফুর ও জুনাইদ মিয়ার নৌকায় থাকা সুনামঞ্জের দিরাই গ্রামের আরেক বাসিন্দা আকমল মিয়া তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই লুৎফুর ও জুনাইদের স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। লুৎফুর রহমান (৪০) হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে, আর জুনাইদ মিয়া (৪০) লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা। সম্পর্কে তারা ভায়রা ভাই। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রিচি গ্রামের দালাল আবদুস সালামের মাধ্যমে ইতালির উদ্দেশে লিবিয়ায় যান তারা।

আকমল মিয়া জানান, লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে ২১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে একটি নৌকা রওনা দেয়। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জনই সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। নৌকার দুজন চালক ছিলেন সুদানি নাগরিক। রাতে ২-৩ ঘণ্টা সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার পরই চালক রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। ছয় দিন সমুদ্রে নৌকা ভাসতে থাকায় প্রচ ক্ষুধা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় অনেকেই ভেঙে পড়েন। প্রচণ্ড পানির পিপাসায় বাধ্য হয়ে সমুদ্রের বিষাক্ত পানি অনেককে পান করতে হয়েছে। পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বমি শুরু হয়। মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে নিস্তেজ হয়ে ১৭ জন মারা যান। ২৪ মার্চ মারা যান নৌকায় থাকা লুৎফুর ও তার ভায়রা জুনাইদ। তাদের লাশ এক দিন নৌকায় রাখা হয়। আকমল মিয়া আরও বলেন, ‘আমরা সহযাত্রীদের লাশ সমুদ্রে ভাসাতে চাইনি। তাদের কবর দিতে চেয়েছি। এক দিন পর নৌকার চালক সুদানিরা লাশগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। তারাও চেয়েছিলেন ১৭ জন ব্যক্তির লাশ নৌকায় রেখে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে বুঝিয়ে দেবেন। কিন্তু লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তা ছাড়া লাশগুলো নৌকায় থাকলে চালকরা বিপদে পড়বেন এ চিন্তা করে তারা সমুদ্রে ফেলে দেন।’ এ বিষয়ে লুৎফুরের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, ২১ মার্চ আমার ভাই ভাবিকে ফোন করে জানান, তাদের নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে বোট (নৌকা) রওনা দেবে। পরে আমরা আর তাদের কোনো সন্ধান পাইনি। রওনা দেওয়ার দুই দিন পর দালালের সঙ্গে যোগাযাগ করা হলে তিনি জানান, তারা গ্রিসে পৌঁছেছেন। এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। এরকম শুনেছি। তবে এখনো বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারিনি। বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights