সাদুল্লাপুর আদালতে ১০ মাস ধরে নেই বিচারক, ঝুলে আছে ৪ হাজার মামলা
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে প্রায় ১০ মাস ধরে স্থায়ী বিচারক নেই। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিচারপ্রার্থীরা। আদালতটিতে দেওয়ানি, পারিবারিক ও ভূমি বিরোধসহ প্রায় ৪ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নিয়মিত বিচারক না থাকায় এসব মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি ব্যাহত হচ্ছে। এতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তি বাড়ছে।
আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সহকারী জজ আবু রায়হান বদলি হয়ে কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালতে যোগ দেওয়ার পর সাদুল্লাপুর আদালতে স্থায়ী বিচারকের সংকট তৈরি হয়। এর আগে দায়িত্বে থাকা সহকারী জজ আবু তাহের প্রশিক্ষণজনিত কারণে বাইরে থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম চলছিল। পরে একাধিক বিচারককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও বর্তমানে পলাশবাড়ী সহকারী জজ আদালতের বিচারক সাদুল্লাপুর আদালতের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
আদালত সূত্র আরও জানায়, প্রতিদিনের কার্যতালিকায় ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত মামলার শুনানি নির্ধারিত থাকে। তবে স্থায়ী বিচারক না থাকায় অনেক মামলায় কার্যকর শুনানি হচ্ছে না। হাজিরা, পিটিশন গ্রহণ ও পরবর্তী তারিখ নির্ধারণের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে জরুরি নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন অন্তর্বর্তীকালীন বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেতেও বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের এ ভোগান্তির প্রতিকার চেয়ে গত ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা ফিহাদ সরকার। আবেদনে আদালতের জুডিশিয়াল হেল্পলাইন নম্বর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। ফিহাদ সরকার বলেন, ‘দুই-চার মাস নয়, প্রায় ১০ মাস ধরে আদালতে স্থায়ী বিচারক নেই।’
সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা আছমা বেগম প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে এ আদালতে মামলা করেন। তিনি বলেন, মামলা নিয়ে আদালতে আসছেন, হাজিরা দিচ্ছেন, আবার পরবর্তী তারিখ দেওয়া হচ্ছে। এতে তাঁর টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু মামলার তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না।
ভরণপোষণের মামলার আরেক ভুক্তভোগী রোজিনা খাতুন বলেন, আদালতের আদেশে একবার ভরণপোষণের টাকা পেলেও পরে তা নিয়মিত পাননি। শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে মামলার তারিখে আদালতে আসেন তিনি। কিন্তু বিচারক না থাকায় শুধু হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
ভূমি বিরোধের একটি বাটোয়ারা মামলার বাদীপক্ষের ভুক্তভোগী খোদেজা বেগমের বয়স ৭০ বছর। তিনি বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে তাঁদের মামলা চলছে। অপর পক্ষও ২০০৪ সালে পৃথক বাটোয়ারা মামলা করে। একটি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণ ও অন্যটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে রয়েছে। গত ১০ থেকে ১১ মাসে একাধিক তারিখ পড়লেও বিচারক না থাকায় এসব কার্যক্রম এগোয়নি।
জমির দলিল সংশোধনের মামলা করা নুরুল আমিন মণ্ডল বলেন, ২০২৪ সালে করা তাঁর মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আর মাত্র দুটি ধাপ বাকি। কিন্তু গত সাত-আট মাস ধরে শুনানির জন্য আদালতে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে।
ভূমি বিরোধের বাটোয়ারা ও স্বত্বঘোষণার দুটি মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট অমল কুমার দাস বলেন, মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে চলতে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। গত মে মাসেও একজন বাদী মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুসনদ ও ওয়ারিশান সনদ আদালতে দাখিল করা হয়েছে। একটি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণ ও অন্যটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে থাকলেও বিচারক না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এসব কার্যক্রম এগোচ্ছে না।
গাইবান্ধা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফুল আলম রঞ্জু বলেন, সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালতে বিচারক সংকটের কারণে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে। দ্রুত নতুন বিচারক নিয়োগ করা হলে এ সমস্যা অনেকটাই কমবে।
আদালতের অফিস সহকারী আনিছুর রহমান বলেন, প্রায় ১০ মাস ধরে আদালতে নিয়মিত বিচারক নেই। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক রয়েছেন। আদালতে প্রায় ৪ হাজার মামলা চলমান। কার্যদিবস ও ধার্য তারিখ অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি মামলার শুনানি তালিকায় থাকে। তবে নিয়মিত বিচারক না থাকায় এসব মামলার অধিকাংশের কার্যকর শুনানি হচ্ছে না।
