সাদেকের নেতৃত্বে আবাহনীর অভিষেক ম্যাচে কী ঘটেছিল

মনোয়ার হক

বাংলাদেশের খেলাধুলার ইতিহাসে আবদুস সাদেকই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি অভিষেক আসরে ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বের শুরুটা হয়েছিল ফুটবল থেকে। দেশ স্বাধীনের পর স্বাধীনতা কাপ দিয়ে ফুটবল মাঠে গড়িয়েছিল। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ঢাকা মোহামেডান। টুর্নামেন্টটি শেষ হওয়ার পরই নতুন মৌসুমের দল বদল শুরু হয়। ১৯৭০ সালে দ্বিতীয় বিভাগ লিগে মোহাম্মদপুর এলাকার ইকবাল স্পোর্টিং চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তাদেরই নবাগত দল হিসেবে প্রথম বিভাগ লিগ খেলার কথা। কিন্তু আর্থিক অনটনে তাদের দল পরিচালনা অসম্ভব হলে বিক্রি করে দেয়। মালিকানা বদলের পর ক্লাবটির নতুন নামকরণ করা হয় ঢাকা আবাহনী ক্রীড়াচক্র।

১৯৭২ সালে অভিষেকেই আবাহনী শক্তিশালী দল গড়ে। দিলকুশা থেকে আনা হয় আবদুস সাদেককে। ইস্ট অ্যান্ড থেকে যোগ দেন দিপু ও আলী ইমাম। সেই সময় স্কুটার বলে খ্যাত রহমতগঞ্জ থেকে গুফরও আবাহনীতে নাম লেখান। সঙ্গে নিয়ে আসেন ডিফেন্ডার বেলালকে। মোহামেডান ছেড়ে আসেন গোলাম সারোয়ার টিপু, কাজী সালাউদ্দিন, অমলেশ সেন, শেখ আশরাফ আলি। ওয়ারীর শামসুল আলম মঞ্জু, গোলরক্ষক তপন, ফায়ার সার্ভিস থেকে আবাহনী দলে ভেড়ায় হাজি কাশেমকে। আজাদের কাদেরসহ তারকা খেলোয়াড় নিয়ে দল গড়ে আবাহনী। কিছু খেলোয়াড় আবার ইকবাল স্পোর্টিংয়ের ছিল।

১৯৭২ সালে প্রথম বিভাগ লিগে উদ্বোধনী ম্যাচটি ছিল বিআইডিসি (পরবর্তীতে বিজেআইসি ও বিজেএমসি) ও ঢাকা আবাহনীর মধ্যে। সেই ম্যাচটি আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ১৯৭০ সালের প্রথম বিভাগ চ্যাম্পিয়ন বিআইডিসি ও নবাগত দল হিসেবে আবাহনী ম্যাচে অংশ নিয়েছিল। তখন তো দোতলা বলতে পশ্চিম গ্যালারির এক অংশ ও ভিআইপি ছিল। পুরো গ্যালারি ভরে গিয়েছিল। মাঠের দুই পাশে বসে দর্শকরা উদ্বোধনী ম্যাচ উপভোগ করেন। মূলত আবাহনীকে ঘিরেই ছিল যত আগ্রহ। একে তো নবাগত দল, তারকানির্ভর, তার পর আবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর বড় ছেলের ক্লাব। সবকিছু মিলিয়ে আবাহনী নিয়েই যত আলোচনা। বিআইডিসি চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে খেলতে নামছে তা নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না। অথচ এই অফিস দলেও তারকা ফুটবলার ছিলেন।

নতুন দলে কে অধিনায়ক হবেন এ নিয়েই দর্শকদের কৌতূহল ছিল। এখন যেমন আগেই অধিনায়কের নাম ঘোষণা হয়, তখন তা ছিল না। শুরুর ম্যাচ দেখেই অধিনায়ককে চেনা যেত। মাঠে প্রবেশ করলেন রেফারি ননী বসাক। তখনো দুই দল মাঠে নামেনি। ভিআইপি থেকে প্রথমে নামল আবাহনী। আর এতেই দর্শকরা চমকে গেলেন। আকাশি নীল জার্সিতে ছিল পুরোপুরি নতুনত্বের ছোঁয়া। আগে জার্সি বলতেই হাফ শার্ট আর হাফ প্যান্ট। কিন্তু আবাহনী টি-শার্ট পড়ে নামল।

আবদুস সাদেক সবার সামনে থেকে দলের সঙ্গে মাঠে নামছেন। সবার আগে মানে তাঁর নেতৃত্বে ফুটবল লিগে আবাহনী যাত্রা করতে যাচ্ছে। অথচ কারোর কারোর ধারণা ছিল টিপুই আবাহনীকে নেতৃত্ব দেবেন। মোহামেডানে খেলা তারকা ফুটবলার, নতুন আবাহনীর সবচেয়ে পরিচিত খেলোয়াড়। এসব মিলিয়ে ধারণাটা ছিল। সালাউদ্দিন তখন স্টার ছিলেন না। স্বাধীনতা কাপে মোহামেডানের হয়ে মাঠ কাঁপিয়ে ছিলেন এই যা। সাদেকের নেতৃত্বে আবাহনীর যাত্রা হলো। উদ্বোধনী ম্যাচে আবাহনীর অধিনায়ক সাদেক করমর্দন করেন বিআইডিসির সলিমুল্লার সঙ্গে। দুই অধিনায়ক হাত মেলানোর পর শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল লিগ।

আবাহনী সেই অভিষেক ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র করেছিল বিআইডিসির বিপক্ষে। ম্যাচে প্রাধান্য ছিল সাদেকদেরই। টিপু ও স্কুটার গফুর দুর্দান্ত খেলেছিলেন। সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করায় জেতা আর সম্ভব হয়নি। বিআইডিসিতে ছিলেন এনায়েত গাজী, ছোট নাজির, গোবিন্দের মতো পরিচিত খেলোয়াড়। এনায়েত ও গাজী আক্রমণ চালালেও স্ট্রপার সাদেক ও গোলরক্ষক হাজি কাশেমের দৃঢ়তায় গোল করা সম্ভব হয়নি। উদ্বোধনী ম্যাচে আবাহনীর সেরা একাদশে ছিলেন গোলরক্ষক হাজি কাশেম, সাদেক, আশরাফ, আনোয়ার, বাদশা, কাদের, আমলেশ, আলী ইমাম, দিপু, সালাউদ্দিন ও টিপু। ১৯৭২ সালে পয়েন্ট টেবিলে আবাহনী শীর্ষে থাকা অবস্থায় লিগ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সেবার আবাহনী ও ওয়ান্ডারার্স ম্যাচে হট্টগোলে লিগ বন্ধ করে দেয় বাফুফে। ম্যাচে আবাহনী অমলেশ ও টিপুর গোলে এগিয়ে ছিল। ১৯৭৩ সালে লিগ শুরু হলেও আবাহনী প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় ১৯৭৪ সালে। এখন তো স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ ১৭ বার লিগ জেতার রেকর্ড আবাহনীরই। এখানে বলে রাখা ভালো-আবাহনীর ফুটবলে প্রথম অধিনায়ক ছিলেন সাদেক। আবার তাঁর প্রশিক্ষণের শুরুটা হয় ১৯৭৭ সালে আবাহনীকে লিগ ও লিবারেশন কাপে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights