সিঙ্গাপুরে বন্ধুত্বের নতুন চিত্র : প্রতি ১০ জনে একজনের নেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু

অনলাইন ডেস্ক

সিঙ্গাপুরে সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের ধরনে ধীরে হলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে এক নতুন গবেষণায়। দেশটির ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ (আইপিএস) পরিচালিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সিঙ্গাপুরের প্রায় প্রতি ১০ জন নাগরিকের মধ্যে একজনের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই।

অর্থাৎ তারা এমন কাউকে চিহ্নিত করতে পারেন না, যার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা যায় বা প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়া সম্ভব। তবে গবেষণাটি একই সঙ্গে জানায়- এখনো সিঙ্গাপুরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার প্রধান মাধ্যম সরাসরি মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ জানিয়েছেন- তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর অধিকাংশের সঙ্গেই প্রথম পরিচয় হয়েছিল স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র বা দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে, অনলাইনে নয়।

২০২৫ সালে পরিচালিত এই সমীক্ষায় ২১ বছর বা তার বেশি বয়সী মোট ৩,৭১৩ জন সিঙ্গাপুর নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দার মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়- মোট অংশগ্রহণকারীদের ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ অন্তত একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কথা উল্লেখ করেছেন। গবেষণায় ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে পরিবারের সদস্য বা প্রেমিক-প্রেমিকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, শুধুমাত্র বন্ধুত্বের সম্পর্ককেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল যুগে অনলাইন সম্পর্কের প্রসার থাকলেও গবেষণায় উঠে এসেছে, মাত্র ২৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের অন্তত একজন অনলাইন বন্ধু রয়েছে- যাদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং যাদের সঙ্গে যোগাযোগ মূলত অনলাইনেই সীমাবদ্ধ। বয়সভেদে এখানে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ অনলাইনে বন্ধু থাকার কথা জানিয়েছেন, যেখানে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার নেমে এসেছে মাত্র ২০ দশমিক ৬ শতাংশে।

শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ অনলাইন বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করলেও, মাধ্যমিক বা তার নিচে শিক্ষিতদের মধ্যে এই হার ২৩ শতাংশেরও কম। গবেষণাটি আরও বলছে- বন্ধুত্বের বৈচিত্র্য অর্থাৎ ভিন্ন বয়স, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় বা শিক্ষাগত পটভূমির মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব- সামাজিক আস্থা, অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি ও নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এমনকি অনলাইনে গড়ে ওঠা কিছু বন্ধুত্বও নির্দিষ্ট সামাজিক ও মানসিক সহায়তার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া সমীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়- সিঙ্গাপুরের প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় একজন ব্যক্তিগত আলাপ, মানসিক সহায়তা বা আবেগীয় সমর্থনের জন্য এআই চ্যাটবট ব্যবহার করছেন। তবে অধিকাংশ উত্তরদাতাই মনে করেন, এ ধরনের যোগাযোগ বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের মতো তৃপ্তিদায়ক নয়।

আইপিএস’র ‘মেজারিং সোশ্যাল ক্যাপিটাল ইন দ্য ডিজিটাল এইজ’ শীর্ষক এই গবেষণার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সামাজিক যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করলেও, ঘনিষ্ঠ ও অর্থবহ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এখনো সরাসরি মানবিক যোগাযোগই সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে রয়ে গেছে। এই গবেষণা সিঙ্গাপুরে বন্ধুত্ব, সামাজিক সম্পর্ক ও ডিজিটাল যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

তথ্য সূত্র : দ্য স্ট্রেইট টাইমস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights