সুলিভান ভাইদের চোখ বিশ্বকাপ ফুটবলে

ক্রীড়া ডেস্ক

বাংলাদেশের ফুটবলে কোটি কোটি সমর্থকের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন রোনান ও ডেকলান সুলিভান। তাঁদের স্বপ্ন শুধু জাতীয় দলের হয়ে খেলা নয়। স্বপ্ন আরও বড়। বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়া। একই স্বপ্ন দেখছেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলিও।

সুলিভান ভাইদের গল্পটা শুরু হয়েছিল ইনস্টাগ্রামের একটি বার্তা থেকে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি সমর্থক পেজ থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে বিষয়টি তাঁদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। পরে বুঝতে পারেন, এটি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করা একটি বৈধ প্ল্যাটফর্ম। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া রাজ্যে অবস্থিত সেন্ট জোসেফস ইউনিভার্সিটির ছাত্রাবাসের কক্ষে সুলিভান পরিবারের দুই যমজ ভাই এসব কথা বলেছেন ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানের সঙ্গে।

রোনান ও ডেকলান তখন যুক্তরাষ্ট্রে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ তাঁদের কাছে ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা। দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আরও যুক্ত হওয়ার ইচ্ছাও ছিল তাঁদের।

সুলিভান ভাইদের মা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। সেই সূত্রেই বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান দুই ভাই। তবে বাংলাদেশে আসার পথটা সহজ ছিল না। তাঁদের মায়ের বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকায় নিজেদের পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াও ছিল বেশ জটিল।

শেষ পর্যন্ত গত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন তাঁরা। বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলের ক্যাম্পে যোগ দেন। সেখানে ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড় ছিলেন। দলে জায়গা নিশ্চিত ছিল না। মাঠে বাধা ছিল ভাষার পার্থক্য। রোনান বলেন, বিদেশি হওয়ায় শুরুতে বল পাওয়া কঠিন ছিল। তবে কয়েকবার বল পেয়ে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েক দিনের অনুশীলনের পর তাঁরা দলে জায়গা পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।

এরপর মালদ্বীপে অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হয়ে খেলেন দুই ভাই। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল গোলশূন্য। টাইব্রেকারে বাংলাদেশের হয়ে শেষ শট নিতে এগিয়ে যান রোনান। তিনি নেন পানেনকা। বল জালে জড়ায়। বাংলাদেশ জিতে নেয় শিরোপা।

মালেতে সেই মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েন হাজারো দর্শক। বাংলাদেশে তখন তৈরি হয় নতুন উন্মাদনা। দেশে ফেরার পর সুলিভান ভাইদের দেওয়া হয় বীরের সংবর্ধনা। ফুল দিয়ে বরণ করা হয় তাঁদের।

ডেকলান সুলিভান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলে এমন উন্মাদনা দেখা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ ট্রফি নিয়ে আসার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের আরও বেশি করে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সুলিভানদের দুই ভাই কুইন ও ক্যাভানও ফুটবলে পরিচিত নাম। তাঁরা ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলছেন। কুইন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেছেন। ক্যাভান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়। ফলে বাংলাদেশের জন্য রোনান ও ডেকলানই ছিলেন বিকল্প। তবে শুধু সুলিভান ভাইয়েরাই নন, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ডুলি। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক অনূর্ধ্ব-২০ দলের সাফ শিরোপা জয়ের সাত সপ্তাহ পর বাংলাদেশ জাতীয় দলে হেড কোচের দায়িত্ব নেন। ডুলির বিশ্বাস, বাংলাদেশের ফুটবলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। তাঁর মতে, ভালো খেলোয়াড়দের একটি দলকে সঠিকভাবে কোচিং করানো গেলে এবং খেলা নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা বদলানো গেলে দলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি করা যাবে। ফিফা র?্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের ১৫০-এর ঘরে ওঠাও তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।

এর পাশাপাশি বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দেরও জাতীয় দলে যুক্ত করতে চান ডুলি। এরই মধ্যে সম্ভাব্য কয়েকজন খেলোয়াড়ের নামও সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন ফুলহ্যাম একাডেমির ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ফারহান ওয়াহিদ এবং ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা ২৫ বছর বয়সি লুই ওয়াটসন। দলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে আছেন হামজা চৌধুরী ও কানাডায় জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার শামিত সোম।

ডুলির কাছে গোলরক্ষক পজিশনও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে খেলোয়াড় খোঁজার সময় প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা পাচ্ছেন তিনি। তবে বাজেটের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাই শুধু পরিচিতি নয়, বাংলাদেশের ফুটবলে সত্যিকার অর্থে অবদান রাখতে পারবেন, এমন খেলোয়াড়ই নিতে চান তিনি।

বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণে শুধু বিদেশি খেলোয়াড় আনাই যথেষ্ট নয়। দেশের ফুটবলের অবকাঠামোও উন্নত করতে হবে। ডুলির পরিকল্পনায় জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই বাড়বে আগ্রহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ। গড়ে উঠবে শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো। বয়সভিত্তিক একাডেমি থেকে খেলোয়াড় উঠে আসবে। তারা জায়গা করে নেবে পেশাদার লিগে। বাংলাদেশের পুরুষ দল ইতিহাসে মাত্র একবার এশিয়ান কাপে খেলেছে। বিশ্বকাপে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে ডুলি মনে করেন, এশিয়ান কাপ কিংবা বিশ্বকাপে খেলা একটি প্রক্রিয়া। আবার সেই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়েও যেতে পারে। সুলিভান ভাইদের চোখেও এখন সেই স্বপ্ন। ডেকলান মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় থাকা যোগ্য বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের একত্র করা গেলে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এটাকেই তিনি তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। আর ডুলি চান, বাংলাদেশের শিশুরা শুধু বিশ্ব ফুটবলের বড় দলগুলোর সমর্থক হয়ে না থাকুক। তারা নিজেরাই ফুটবলার হোক। তারা একদিন সেই বড় দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে নামুক। ডুলি বলেন, ‘আমরা চাই না শিশুরা আর্জেন্টিনার সমর্থক হোক। আমরা চাই তারা খেলোয়াড় হয়ে উঠুক, যাতে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে খেলতে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights