সৌদিতে হুতি হামলায় কি মক্কা চুক্তি কার্যকর হবে?

অনলাইন ডেস্ক

ইয়েমেনের হুতিদের ধারাবাহিক হামলা এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আক্রমণের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। প্রশ্ন উঠছে, সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা আরও বাড়লে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কি বাস্তবে কার্যকর করা হবে? আর যদি তা হয়, তাহলে সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের সামরিক ভূমিকা নিতে পারে?

ইয়েমেনের হুতিরা মোখা বন্দর দখলের পর বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার হুমকি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরেও হামলা চালিয়েছে তারা। এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি, বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় একের পর এক হামলার পাশাপাশি ইরান ও তার ইয়েমেনি মিত্র হুতিদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবরোধের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

মক্কা চুক্তি কী?
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রধান অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতার ক্ষেত্রে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও ওয়াশিংটন আর আগের মতো সব ধরনের নিরাপত্তার দায়িত্ব এককভাবে নিতে চাইছে না।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অবস্থানেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। আঞ্চলিক মিত্রদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা দিতে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র হিমশিম খেয়েছে। এমনকি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও কয়েক দফা হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে ওয়াশিংটন।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে আসা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব বাড়ানোর আহ্বানের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে এগোতে শুরু করে।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান প্রথমবারের মতো একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। চলতি বছরের আগস্টে তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে চুক্তিটির পরিধি আরও বাড়ানো হয়। পরে এটি মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নামে পরিচিতি পায়।

চুক্তির আওতায় তিন দেশ একটি যৌথ সচিবালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এর সদর দফতর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে। প্রাথমিক তিন বছরের জন্য সচিবালয়ের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছে পাকিস্তান।

এখনও পুরোপুরি কার্যকর নয়
তবে মক্কা চুক্তি এখনও প্রাথমিক বা বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। কোনও সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে অন্য সদস্যরা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে, তা প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

চুক্তির সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধব্যবস্থা, সামরিক পরামর্শ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বাহিনীর দায়িত্ব ও ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ বা সংঘাতে অংশগ্রহণের নিয়ম—এসব বিষয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

তাই সৌদি আরব আক্রান্ত হলে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবে প্রয়োগ করা হবে, সেটি এখনও বড় ধরনের অজানা বিষয়।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য
সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে কোনও আগ্রাসন হলে অথবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর হবে।

তিনি এ বিষয়ে কোনও ধরনের সন্দেহ থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন।

তবে চুক্তি কার্যকর হলে পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।

অন্যদিকে গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চুক্তিটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিয়েছেন। তার মতে, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর মতো করেই কাজ করবে। অর্থাৎ কোনও সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে প্রথমে সেই দেশকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা চাইতে হবে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও নির্দিষ্ট করতে হবে।

ন্যাটোর মডেল কী বলে?
ন্যাটোর চতুর্থ অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল ৪ অনুযায়ী কোনও সদস্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে জোটের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ ও তথ্য বিনিময়ের আহ্বান জানাতে পারে।

অন্যদিকে আর্টিকেল ৫ সদস্য রাষ্ট্রের ওপর পারস্পরিক সহায়তার নীতি প্রয়োগ করে। তবে আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করতে গিয়ে প্রত্যেক সদস্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ওপরই থাকে।

২০১২ সালে সিরিয়া একটি তুর্কি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার পর তুরস্ক ন্যাটোর আর্টিকেল ৪-এর আওতায় জোটের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল এবং নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছিল।

তুরস্ক সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি না করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের অনুরোধ করেছিল। ন্যাটো সেই অনুরোধ অনুমোদন করে এবং তুরস্কের আকাশসীমা সুরক্ষায় প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়।

মক্কা চুক্তিও যদি একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করে, তাহলে সৌদি আরবকেই প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে তার কী ধরনের সামরিক সহায়তা প্রয়োজন।

পাকিস্তান কি ইয়েমেনে সেনা পাঠাবে?
ধরা যাক, সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ করল। সেক্ষেত্রে শুধু অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য বা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বাইরে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।

তবে এর মাত্রা ও ধরন সম্ভবত যৌথ পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ সৌদি আরবের অনুরোধ এবং পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া—দুটিই আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এখন পর্যন্ত অবশ্য মক্কা চুক্তির এই ব্যবস্থা বাস্তবে পরীক্ষা হয়নি। সৌদি আরব পাকিস্তান বা তুরস্ক—কোনও দেশের কাছেই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি কার্যকর করার আবেদন জানায়নি।

কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে
এর মধ্যেই সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে ইরানকে হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুমকি সৃষ্টি থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

একই সঙ্গে তেহরানকে রিয়াদের প্রতিরক্ষার বিষয়ে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তুরস্কও হুতি ও ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরিতে নিজস্ব ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এবং সৌদি আরব কিংবা বাব আল-মানদেবকে ঘিরে হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদির প্রতি তাদের বিমান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও বাড়াতে পারে।

সৌদি আরবে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার বহুমুখী যুদ্ধবিমান, বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।

তবে আপাতত ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।

এর পেছনে পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পাকিস্তানের অংশগ্রহণের দীর্ঘমেয়াদি ও বিপর্যয়কর প্রভাব দেশটি এখনও বহন করছে। ফলে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে নতুন কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে ইসলামাবাদ যথেষ্ট সতর্ক থাকবে।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হলে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তপ্রদেশগুলোর অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা কিংবা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাও কঠিন হতে পারে।

সম্ভাব্য পরিস্থিতি কী?
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো, পাকিস্তান ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে, যাতে তেহরান হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তান সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও জোরদার করতে পারে।

পাশাপাশি বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক নৌজোট গঠনের উদ্যোগেও পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ধরনের সংযত অবস্থান মক্কা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য—সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—অক্ষুণ্ন রাখবে। একই সঙ্গে সরাসরি আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে উত্তেজনা প্রশমনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হবে।

নতুন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে সময় লাগবে
মক্কা চুক্তির মতো নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো কার্যকর ও পরিপক্ব হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। যৌথ প্রতিক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম এবং সদস্যদের দায়িত্ব পুরোপুরি নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিটির বাস্তব সক্ষমতা সীমিত থাকবে।

ততদিন সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একইভাবে অন্যান্য আরব অংশীদারের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

তবে হুতিদের হামলা যদি সৌদি ভূখণ্ডে আরও বিস্তৃত হয় এবং বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তাহলে মক্কা চুক্তির রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তব সামরিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার চাপ তিন দেশের ওপরই বাড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights