স্বপ্নের প্যারিস তালা যেখানে বলে ভালোবাসার গল্প

মতিউর রহমান মুন্না, প্যারিস

প্যারিস- যে শহরকে বিশ্বজুড়ে বলা হয় ভালোবাসার শহর। শহরটির প্রতিটি কোণে যেন রোমান্সে ভরা। সিন নদীর তীরে হাতে হাত রেখে হাঁটা, আইফেল টাওয়ারের আলোয় একে অপরের মুখ দেখা, কিংবা পাহাড়চূড়ায় গিয়ে পুরো প্যারিসকে দেখা। আর এ শহরের মঁমার্ত্র পাহাড়েই রয়েছে ভালোবাসার আরেক নিদর্শন- ভালোবাসার তালা। হালকা ঠান্ডা বাতাসে মঁমার্ত্র পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখা মেলে সাদা গম্বুজওয়ালা সেই বিখ্যাত গির্জা- সাঁক্রে-ক্যর ব্যাসিলিকা। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, যেন মেঘের কোল ঘেঁষে। দূর থেকে পুরো প্যারিস দেখা যায়- এক রূপকথার শহর। গির্জার সামনে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে অদ্ভুত দৃশ্য- লোহার রেলিংজুড়ে ঝুলছে শত শত তালা। সেখানে এক নবদম্পতি তালা লাগিয়ে হাসছেন। জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটি হেসে বলল, ‘এখানে তালা লাগিয়ে চাবিটা ফেলে দিলেই ভালোবাসা চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়- এটাই প্যারিসের প্রতিশ্রুতি।’ তাদের সেই হাসিতে যেন ভালোবাসার শহরের আত্মাটাই ধরা পড়ল। সাঁক্রে-ক্যর গির্জার চারপাশে শুধু তালা নয়, আছে গল্পের ছায়া। কেউ এসেছে নববিবাহিত হয়ে, কেউ এসেছে সম্পর্কের নতুন শুরুতে। দুজন মিলে নাম লেখা একটি তালা ঝুলিয়ে দেয়, তারপর চাবিটি ছুড়ে দেয় দূরে- সিন নদীর দিকে কিংবা নিচের শহরের দিকে। তাদের বিশ্বাস, ‘যেমন তালা খোলার উপায় থাকে না, তেমনি এই ভালোবাসাও কখনো ভাঙবে না।’ এই রীতিটিই আজ প্যারিসের প্রেমিকযুগলদের এক চিরন্তন ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভালোবাসার শহরের তালার ঠিকানাগুলো প্যারিসে এই ‘লাভ লক’ বা ভালোবাসার তালার সংস্কৃতি শুধু পাহাড়চূড়ায় সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে আছে গোটা শহরে। সিন নদীর ওপর অবস্থিত এ সেতুটিতেই শুরু হয়েছিল প্যারিসের ‘লাভ লক’ ঐতিহ্য। একসময় হাজার হাজার তালায় ভরে গিয়েছিল রেলিং, যার ওজনে সেতু দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ অনেক তালা সরিয়ে ফেললেও এখানেই শুরু হয়েছিল ভালোবাসার গল্পের বন্ধন। এটি সিন নদীর সবচেয়ে পুরোনো সেতুগুলোর একটি। এখানে এখনো অনেক যুগল গোপনে তালা লাগিয়ে যায়, ভালোবাসার নিঃশব্দ প্রতীক হিসেবে। সেতুর নিচের রেলিং ও ভিউ পয়েন্টে পর্যটকরা এসে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তালা লাগান। কেউ নাম লেখেন, কেউ শুধু একটি হৃদয়ের চিহ্ন এঁকে রাখেন স্মৃতির সীমানায়। এ এলাকায় পাহাড়চূড়ার রেলিং, গির্জার সিঁড়ি ও আশপাশের দেয়ালজুড়ে ঝুলে থাকে ছোট ছোট তালা। কোনোটিতে লেখা ‘Love Forever’। আবার কোনোটিতে শুধুই তারিখ লেখা, যেদিন তারা একে অপরের হাত ধরেছিল। ভালোবাসা হয়তো দেখা যায় না, কিন্তু প্যারিসে সেটি অনুভব করা যায়- তালার ধাতব শব্দে, গির্জার সিঁড়িতে বসা হাসিমুখে, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো রোমান্সের সুবাসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights