স্বমহিমায় চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদ
জামান আখতার, চুয়াডাঙ্গা
আড়াই শ বছর ধরে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রথম মসজিদ ‘বড় মসজিদ’। এই মসজিদ থেকেই চুয়াডাঙ্গা শহরে প্রথম আজানের সুর ধ্বনিত হয়েছিল। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আলম পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও মসজিদটি তার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে পরিচিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মসজিদটি এলাকায় ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এটি শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনুমানিক ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে (১২০৮ হিজরি) চুয়াডাঙ্গার বড় মসজিদটি স্থাপন করা হয়। এলাকার কুসুম বিবি নামের এক মহিয়সী নারী ৭৩ শতাংশ জমির ওপর নিজ অর্থায়নে মসজিদটি নির্মাণ করেন। শুরুতে মসজিদটির ভিতরে দুই কাতার ও বারান্দায় এক কাতারে নামাজ আদায় করা যেত। সাকল্যে ৭০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারতেন। চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণ কেন্দ্র একাডেমি মোড় এলাকায় এলেই চোখে পড়ে ঐতিহ্যবাহী ‘বড় মসজিদ’। পাঁচ তলাবিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন মিনারের কারণে অনেকের কাছে মসজিদটি ‘মিনার মসজিদ’ হিসেবেও পরিচিত। শহরের অনেক এলাকা থেকেই মসজিদের সুউচ্চ মিনার চোখে পড়ে। সময়ের পরিবর্তনে এটি বর্ধিত করা হয়েছে। বর্তমানে মসজিদটিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও কিছু অংশে সংস্কারের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মসজিদের নাম অনুসারে মহল্লার নামকরণ হয়েছে ‘মসজিদ পাড়া’। ২০০০ ও ২০১৪ সালে মূল অবকাঠামো ঠিক রেখে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। সংস্কারের মাধ্যমে এর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নামাজের জায়গা সম্প্রসারণ এবং নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। ফলে বর্তমানে এটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি বৃহৎ জামে মসজিদ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৭০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের মিনারের তৃতীয় তলার বেলকনির একাংশ ভেঙে গেছে। মিনারটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুসল্লিরা। মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি কবরস্থান। মসজিদ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ইবরুল হাসান জোয়ার্দ্দার বলেন, প্রচলিত আছে, কুসুম বিবি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন। নিজের বাড়ি নির্মাণের সময় তিনি মাটির নিচে পাঁচ থেকে ছয় কলস স্বর্ণমোহর খুঁজে পান। বিপুল সম্পদ পেয়েও তিনি ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস না করে, মোহরগুণো কীভাবে ব্যয় করা যায় তা নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। এলাকার ধর্মপ্রাণ মানুষদের পরামর্শে কুসুম বিবি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। শোনা যায়, সে সময় নির্মাণকাজে ডিমের কুসুম ও সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করে মসজিদের ভিত্তি ও দেয়াল তৈরি করা হয়। যা সেই যুগের আধুনিক নির্মাণশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ।
