স্বাস্থ্যে দ্বিগুণ বরাদ্দ বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

জয়শ্রী ভাদুড়ী

নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যা গত বছরের বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিদ্যমান সিস্টেমের দুর্বলতা দূর না করে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রুমানা হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের বেশি করা হয়েছে, যা ইতিবাচক দিক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে এ বাড়তি বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল। বাজেটে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে করছাড়ের ঘোষণা প্রশংসিত হয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে করছাড় দেওয়া হয়েছে। মেডিকেল ইকুইপমেন্ট আমদানিতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে। সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা করেছে। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ কার্ডের সুবিধাভোগী কারা হবেন এবং এটি কত দিন দেওয়া হবে, তার সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। এটি জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বা ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে কীভাবে সমন্বিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কার্ডের মাধ্যমে সেবা কি কেবল সরকারি হাসপাতাল থেকে পাওয়া যাবে, নাকি বেসরকারি খাতকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে সেটিও বিবেচ্য বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে এবারের বাজেটে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী

নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এ নিয়োগ প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয় এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই দক্ষ জনবল নিয়োগ করা হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও এর সুফল পাওয়া মূলত বাস্তবায়নসক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে রাজস্ব আহরণের ঘাটতি থাকলে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ শেষ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়ার শঙ্কা থাকে। অতীতে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় বাধা। ওষুধ শিল্পের মতো চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী শিল্পকেও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া উচিত। এতে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। নার্সদের বিদেশে পাঠানোর জন্য বিশেষ ট্রেনিংয়ের বিষয়ে এ বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিনের অডিট আপত্তি, সমন্বয়হীনতা, প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ধীরগতি, অদক্ষতা, দীর্ঘসূত্রতা বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সামগ্রিকভাবে এ বাজেটকে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নমুখী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমাতে হলে ই-হেলথ কার্ডের সঠিক বাস্তবায়ন, ওষুধ ও ভ্যাকসিনের সহজলভ্যতা এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।’ বাজেট বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ‘গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এ বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ এবং জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ০.৫৮ থেকে বেড়ে ১.০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ বাজেটের গুরুত্ব কেবল বরাদ্দের অঙ্কে নয়; বরং এ অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং জনগণ এর কতটা সুফল পাবে সেটিই মূল প্রশ্ন। এবারের বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো উন্নয়ন খাতে ২৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বিশেষ ব্লক বরাদ্দ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো নিয়মিত প্রকল্প প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি। ফলে এ ব্লক বরাদ্দ সেসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বরাদ্দ ব্যবহারের সীমিত সক্ষমতা। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উন্নয়ন বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকল্প বিলম্ব, ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে যথাসময়ে ব্যয় করা যায়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়নের প্রকৃত ফল নিশ্চিত করতে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জনবল, সরঞ্জাম, ওষুধ, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার সমন্বিত প্রস্তুতি। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নেই; যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে কিন্তু পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল নেই। ফলে উন্নয়ন হলেও তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights