হঠাৎ কাশ্মীরে বই জব্দের অভিযান কেন?

অনলাইন ডেস্ক

নয়াদিল্লি কর্তৃক সরাসরি শাসিত ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের লাইব্রেরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান। ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘সন্ত্রাসবাদে মদদ জোগায়’ এমন অভিযোগে সমস্ত সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি থেকে বই এবং ডিজিটাল আর্কাইভ জব্দের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলটির শিক্ষাঙ্গন ও বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। পণ্ডিত ও স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে কাশ্মীরের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও ঐতিহাসিক সত্যকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।

চলতি মাসের শুরুতে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়। এতে লাইব্রেরি ও লার্নিং রিসোর্স সেন্টারগুলোতে থাকা বই, জার্নাল, সাময়িকী এবং অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রীর ওপর বহুমুখী নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যে সমস্ত প্রকাশনায় চরমপন্থা, সহিংসতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ বা ভারতবিরোধী আদর্শ প্রচার করা হয় অথবা যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার পরিপন্থী, তা লাইব্রেরি বা শিক্ষাঙ্গন থেকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।

এই অঞ্চলভিত্তিক শুদ্ধি অভিযানের সূত্রপাত হয় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু নেতার আপত্তির পর। ‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পের আওতায় আড়াইশটিরও বেশি স্কুলে বিতরণের জন্য নির্ধারিত দুটি বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি তোলে বিজেপি। বইগুলো হলো হিলাল আহমেদ ও সন্তোষ মিনা রচিত ‘পারসোনালিটিস অ্যান্ড লিজেন্ডস অব জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর’ এবং ড. সুশান্ত গিরি রচিত ‘গ্রেট পারসোনালিটিস অব জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর’। বিরোধী দলনেতা সুনীল শর্মা অভিযোগ করেন, বইগুলোতে ‘ভারত-অধ্যুষিত কাশ্মীর’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত এবং তরুণদের মনে বিচ্ছিন্নতাবাদী বীজ বপনের চেষ্টা।

তীব্র প্রতিবাদের মুখে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রশাসনিক প্রধান মনোজ সিনহা স্কুল শিক্ষা দপ্তরের আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন এবং সংশ্লিষ্ট লেখক ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্তের নির্দেশ দেন। ইতোমধ্যে ওই দুটি প্রকাশনা সংস্থাকেও কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং তাদের পূর্ব প্রকাশিত অন্যান্য উপাদানও প্রচলন থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকেই কাশ্মীর উপত্যকায় ইতিহাস ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণের চলমান দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই অংশ। এর আগে গত বছরও বেশ কিছু প্রথিতযশা লেখকের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক গ্রন্থ ও গবেষণা প্রবন্ধ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নতুন এই দমনপীড়নের কারণে সাধারণ মানুষ ও গবেষকদের মনে এক ধরনের চরম ভীতি কাজ করছে, যার ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে রাজনৈতিক ইতিহাস ও ইসলামি সাহিত্য বিষয়ক বইপত্র সরিয়ে ফেলতে শুরু করেছেন।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights