১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে কঠিন সময়ে ইরান, যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ?

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানকে পরীক্ষা করতে চায়, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দেশটি। এদিকে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে ইতোমধ্যে নজিরবিহীন নিরাপত্তা অভিযান ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অতীতের যেকোনো সংকটের তুলনায় এবারের দমননীতি আরও কঠোর। যেসব রাজপথ কদিন আগেও সরকারবিরোধী স্লোগানে মুখর ছিল, সেগুলো এখন ক্রমে নীরব হয়ে আসছে।

তেহরানের এক বাসিন্দা বিবিসি পারসিয়ানকে বলেন, ‘শুক্রবার অবিশ্বাস্য ভিড় ছিল, চারদিকে গুলির শব্দ। শনিবার রাতে হঠাৎ করেই সব অনেক শান্ত হয়ে যায়।’ একজন ইরানি সাংবাদিকের ভাষায়, ‘এখন বাইরে বেরোতে হলে মৃত্যুর ইচ্ছা থাকতে হয়।’ এবারের সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহিরাগত হুমকিও। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। ইরান–ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার মাত্র সাত মাস পর এই হুমকি নতুন করে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করেছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরান আবার আলোচনায় ফিরতে যোগাযোগ করেছে। তবে তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, বৈঠকের আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কোনো পদক্ষেপ’ নিতে হতে পারে। তবে আলোচনার টেবিলে ইরানের হাতে শক্ত কোনো কার্ড নেই। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত—শূন্য মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, যা ইরানের জন্য একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এটি দেশটির ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার কৌশলগত মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ‘ইরান’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ বইয়ের লেখক ভালি নাসর বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের প্রবণতা হলো কঠোর দমন চালিয়ে এই মুহূর্তটা টিকে যাওয়া। এরপর তারা ভাববে, সামনে কী করবে। কিন্তু যদি তারা এই আন্দোলন দমনও করে সামনের দিনে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও নানা নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানিদের জীবনমান উন্নত করার মতো বিকল্প তাদের হাতে খুব কম।’
এই সপ্তাহটি নির্ধারণ করে দিতে পারে, পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কূটনীতিকদের জানিয়েছেন, ‘পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে।’

তবে পাঁচ দিন ধরে চলা যোগাযোগ অবরোধের মধ্যেও বাস্তব চিত্র বাইরে পৌঁছাচ্ছে। স্টারলিংক স্যাটেলাইট, প্রযুক্তিগত কৌশল আর সাহসের মাধ্যমে ফাঁস হচ্ছে ভয়াবহ তথ্য, হাসপাতালগুলোতে আহতদের ঢল, খোলা জায়গায় অস্থায়ী মর্গ, সারি সারি কালো মরদেহের ব্যাগ। এর মাঝে, দিনের আলোয় তেহরানের রাস্তায় সরকার সমর্থকদের মিছিলও দেখা গেছে।

২০২২-২৩ সালের ছয় মাসব্যাপী আন্দোলনে প্রায় ৫০০ মানুষের মৃত্যু ও ২০ হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছিল মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিহতের সংখ্যা সেই সীমা ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও মৃত্যুর বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করছে না। বিক্ষোভকারীদের নিহত হওয়ার খবর এবং অস্থায়ী মর্গের দৃশ্য সম্প্রচার করা হচ্ছে।

সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া ও সহিংসতার ঘটনায় সরকার ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজ’ আখ্যা দিচ্ছে আন্দোলনকারীদের। ‘খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এমন অভিযোগে আইনি ভাষাও হয়েছে ভয়ংকর—যাতে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সরকারের অভিযোগের তীর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বিদেশি শত্রুদের দিকে। বিশেষ করে গত বছরের সংঘাতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অনুপ্রবেশের বিষয়টি এই অভিযোগকে আরো জোরালো করেছে। এই আন্দোলনের শুরুটা ছিল নিতান্তই দৈনন্দিন এক ঘটনায়। ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের আমদানিনির্ভর ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসায়ীরা আকস্মিক মুদ্রাপতনে দোকান বন্ধ করে ধর্মঘট ডাকেন। সরকার প্রথমে আলোচনার আশ্বাস দেয়। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ‘যৌক্তিক দাবির’ কথা স্বীকার করেন। সবার হিসাবে প্রায় সাত ডলার করে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি থামেনি; বরং পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। তিন সপ্তাহের মধ্যেই ছোট শহর থেকে বড় নগর, সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। দাবি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও।

এদিকে, সোমবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা আছে। তবে ইরান সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এখন ইরানের সামরিক প্রস্তুতি অনেক বেশি। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights