২৭ বছর পর দেশে ফিরলেন ‘হারিয়ে যাওয়া’ আমির
বিশেষ প্রতিনিধি :
ঘড়ির কাঁটা যেন আজ অন্যরকমভাবে এগোচ্ছে শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার একটি পরিবারের জন্য। প্রায় তিন দশক আগে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়া যে মানুষটির সঙ্গে হঠাৎ করেই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সেই আমির হোসেন তালুকদার (৬২) অবশেষে ফিরলেন ঘরে। বুধবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাতিক এয়ারের (ওডি-১৬২) ফ্লাইটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছান তিনি।
বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেন। প্রায় ৩০ বছর পর বাবাকে ফিরে পেয়ে ছেলে বাবু তালুকদারসহ স্বজনদের মধ্যে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। পরে ব্র্যাকের উদ্যোগে তাকে শরীয়তপুরের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে জীবিকার সন্ধানে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান আমির হোসেন। প্রবাস জীবনের শুরুতে প্রথম তিন বছর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল পরিবারের সঙ্গে। চিঠি, ফোন—সবই চলছিল স্বাভাবিকভাবে। এমনকি কিছু অর্থও পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দিন গড়িয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছর—একসময় তা দীর্ঘ ২৭ বছরের অন্ধকারে পরিণত হয়।
দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বজনরা একপর্যায়ে ধরে নেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। পরিবারে তার স্মৃতি তখন কেবল গল্প, পুরোনো ছবি আর নিঃশব্দ কষ্টে বেঁচে ছিল।
ঘটনায় নাটকীয় মোড় আসে সম্প্রতি। মালয়েশিয়ার পেনাং অঞ্চলে প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশি জঙ্গলের ভেতর একটি ছোট টিনের ঘরে মানবেতর অবস্থায় এক ব্যক্তিকে দেখতে পান। পরে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় সেখানে বসবাস করছিলেন। অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনিই নিখোঁজ আমির হোসেন।
প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস এবং পেনাং প্রবাসী দিপুর উদ্যোগে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন। এরপর ব্র্যাকের সহায়তায় শুরু হয় দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস তাকে ট্রাভেল পাস প্রদান করে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ৩০ বছর প্রবাসে থেকে ২৭ বছর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগহীন থাকা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগেই তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনা প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তার একটি বড় উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, এখনো কতজন প্রবাসী এমন সংকটে আছেন, তার সঠিক হিসাব নেই। প্রযুক্তির এই যুগে প্রবাসীদের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করা জরুরি, যাতে এমন ঘটনা দ্রুত শনাক্ত ও সমাধান করা যায়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমির হোসেনের এই ফিরে আসা শুধু একজন মানুষের ঘরে ফেরা নয়; এটি একটি পরিবারের ২৭ বছরের অশ্রু, অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার শেষ অধ্যায়। নড়িয়ার সেই বাড়িতে এখন আনন্দের আবহ, তবে এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া সময়ের দীর্ঘ হিসাব।
