অন আতশবাজির আনন্দই টেনে আনছে বিপর্যয়, উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

অনলাইন ডেস্ক
আনন্দ-উল্লাসের প্রতীক হলেও আতশবাজির স্বাস্থ্যঝুঁকি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা নিয়ে সম্প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেস (ইউসিএলএ)-এর গবেষকরা বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য বিএমজে’-তে প্রকাশিত একটি মতামত কলামে এই বিপদের কথা তুলে ধরেছেন এবং আতশবাজির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর জোরালো দাবি জানিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে নানা উৎসব, জাতীয় দিবস কিংবা উদযাপনের রাতে আতশবাজির আলোয় আকাশ রঙিন হয়ে উঠলেও এর পেছনের অন্ধকার দিকটিতে প্রায়ই নজর দেওয়া হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আতশবাজির কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। সাধারণ চিকিৎসাগত জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে মারাত্মক দগ্ধ হওয়া, বিস্ফোরণের ধাক্কায় সৃষ্ট আঘাত, ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি বা মস্তিষ্কে আঘাত, আঙুল কেটে যাওয়া কিংবা স্থায়ী অন্ধত্ব। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের আঘাতগুলো মূলত শিশু, তরুণ পুরুষ, গ্রামীণ জনপদের মানুষ, নিম্ন আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং কোনো অপরাধ ছাড়াই এর কাছাকাছি থাকা নিরীহ পথচারীদেরই বেশি শিকার বানায়।

এই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর আইনগত নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতামূলক প্রচারণার ওপর জোর দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আতশবাজির ব্যক্তিগত ব্যবহারের পক্ষে যে প্রচারণা চালানো হয়, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন। চিকিৎসাসংস্থা এবং জনস্বাস্থ্য বিভাগগুলোর উচিত মানুষকে বাড়িতে আতশবাজি না ফুটিয়ে জনসমক্ষে আয়োজিত পেশাদার ও নিরাপদ প্রদর্শনীগুলো উপভোগ করতে উৎসাহিত করা।

পাশাপাশি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে স্কুলভিত্তিক প্রচারণা চালানোর কথাও বলা হয়েছে। আতশবাজি ব্যবহারে অসাবধানতার পরিণতি বোঝাতে সেখানে ভুক্তভোগী মানুষের বাস্তব জীবনের গল্প ও আঘাতের ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া সিগারেটের প্যাকেটের মতো আতশবাজির প্যাকেটেও আঘাতের গ্রাফিক সতর্কবার্তা ছাপানোর পরামর্শ দিয়েছেন লেখকরা, যাতে সাধারণ মানুষ এর ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন হতে পারে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও প্রতি বছর আতশবাজির কারণে হাজার হাজার মানুষকে জরুরি চিকিৎসার শরণাপন্ন হতে হয়। তবে সব দেশ এই ঘটনার সঠিক হিসাব বা জাতীয় নিবন্ধন সংরক্ষণ করে না। যে কটি দেশ নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে, তার মধ্যে নেদারল্যান্ডস অন্যতম। ২০২৫-২০২৬ সালের নববর্ষের উদযাপনের সময় দেশটিতে প্রায় ১২০৩৯ জন মানুষ হাসপাতাল বা জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে সেবা নিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, নববর্ষের সময় দেশটিতে ২৮৩ জন আহত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে ৫৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

এই বাস্তবতায় স্বাস্থ্যকর্মীরা স্পষ্টভাবে বলছেন যে, আতশবাজির কারণে হওয়া আঘাতের প্রকৃত চিত্র বা পরিধি নিখুঁতভাবে বুঝতে হলে জরুরিভিত্তিতে একটি সুশৃঙ্খল জাতীয় তথ্যভান্ডার বা ডেটা কালেকশন সিস্টেম থাকা দরকার।

তা সত্ত্বেও, তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে ইউরোপে আতশবাজির বাজার কেবল টিকে আছে তা নয় বরং এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোস্টেটের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ব্লকটির বাইরে থেকে ৯.৫ শতাংশ বেশি পরিমাণ অর্থাৎ মোট ১ লাখ ২০ হাজার টন আতশবাজি আমদানি করেছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৪০৬.৭ মিলিয়ন ইউরো। এটি আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের একটি কার্যবিবরণী নথিতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাইরোটেকনিক বা আতশবাজির আমদানি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে ৪৫২ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছায়, যার বড় অংশজুড়েই রয়েছে আতশবাজি। এই আমদানির ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে নেদারল্যান্ডস ও জার্মানি। ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা মোট আতশবাজির ৩৭.০ শতাংশ গেছে নেদারল্যান্ডসে এবং ৩৫.৬ শতাংশ গেছে জার্মানিতে, এর পরেই ৭.৪ শতাংশ নিয়ে রয়েছে পোল্যান্ড।

ইউরোপজুড়ে ভোক্তা আতশবাজি নিয়ন্ত্রণে একটি সাধারণ ইউরোপীয় নির্দেশিকা রয়েছে, যা পণ্যের নিরাপত্তার মানগুলোকে এক সুতোয় বেঁধেছে। তবে এর পাশাপাশি প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের নিজ দেশে আতশবাজির বিক্রি, নিজ দায়িত্বে রাখা এবং ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এই ইইউ কাঠামোর অধীনে বিপদ ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে আতশবাজিকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

খুব কম ঝুঁকিপূর্ণ, ঘরের ভেতর বা কাছাকাছি ব্যবহারের জন্য তৈরি স্পার্কলার এবং পার্টি পপারের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। তবে জার্মানি এবং ফ্রান্সে এই বয়সসীমা আরও বেশি; সেখানে সীমিত পরিসরে ব্যবহারের জন্য কম ঝুঁকির আউটডোর আতশবাজির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ১৬ এবং ১৮ বছর বয়স হওয়া বাধ্যতামূলক। আর মাঝারি ধরনের ঝুঁকির আতশবাজি, যেগুলো বড় খোলা জায়গায় বহিরঙ্গন ব্যবহারের জন্য এবং কেবল বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্যই তৈরি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ইইউ নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়স হলো ১৮ বছর। এর বাইরে নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালির মতো দেশগুলো জনস্বার্থে আরও কঠোর জাতীয় নিয়মকানুন চালু করেছে।

সূত্র: ইউরোনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights