অবৈধ দখলে রংপুরে মৃতপ্রায় নদ-নদী, কার্যকর উদ্যোগ নেই

নজরুল মধা, রংপুর
রংপুর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে নদ-নদীর সংখ্যা ৩৩টি। কারও কারও মতে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব নদীর একটিরও অবস্থা ভালো নেই। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী ও করতোয়ার মতো বড় নদীগুলোও এখন মারাত্মকভাবে দূষণ ও দখলের শিকার।

রংপুর জেলায় ‘বুড়াইল’ নামে আলাদা আলাদা তিনটি নদী রয়েছে। এছাড়া ছোট আখিরা, নলেয়া, সোনামতি, কাফ্রিখাল, শালমারা, মরা তিস্তা, ঘিরনই, বুল্লাই, মানাস, বাইশাডারা, ধাইজান ও খটখটিয়া নদীর অবস্থাও দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্য দিয়ে মোট সাতটি নদী প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলো— ঘাঘট, শ্যামাসুন্দরী (কারও মতে এটি নদী), ইছামতী, বুড়াইল, খোকসা ঘাঘট ও আলাইকুমারী। এসব নদীর প্রতিটিতেই রয়েছে নানা ধরনের অবৈধ দখল। কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই, কোথাও আবার নদীর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, শ্যামাসুন্দরীকে কেউ কেউ খাল বললেও রাজা জানকীবল্লভ সেন এটি পুনঃখনন করেছিলেন, যা একসময় নদী হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে আজ এই নদীগুলো মৃত্যুপথযাত্রী। একসময় খরস্রোতা এসব নদী এখন কেবল অতীত স্মৃতি।

শ্যামাসুন্দরী নদীতে ১৭০ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হলেও উচ্ছেদ অভিযান বর্তমানে থমকে রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর পূর্ব প্রান্তে সাতমাথা সড়কের পাশে অবস্থিত খোকসা ঘাঘট এখন প্রায় খালে পরিণত হয়েছে। অনেক জায়গায় নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাঁদের বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছেন— একসময় খোকসা ঘাঘট ছিল খরস্রোতা নদী, যার চারপাশে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। দখল ও দূষণের কারণে আজ নদীটি অস্তিত্ব সংকটে।

নগরীর পুরনো শহর মাহিগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ইছামতী নদীর অবস্থাও করুণ। নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বসতভিটা। মাহিগঞ্জের বাসিন্দা দুলাল বলেন, “দ্বাদশ শতকে এই নদীপথেই মৎস্য আকৃতির বাহনে একজন আল্লাহর ওলি এসেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই মাহিগঞ্জের নামকরণ। একসময় ইছামতী নদীকে কেন্দ্র করে এখানে নদীবন্দর ছিল, যা বহু আগেই হারিয়ে গেছে।” বর্তমানে নদীর যে সামান্য অংশ রয়েছে, সেটিও দখল ও ভরাটের শিকার।

রংপুর নগরীর সাতমাথা হয়ে দক্ষিণ প্রান্তের পার্ক মোড় এলাকায় খোকসা ঘাঘটের অবস্থা আরও ভয়াবহ। নদী বলে চেনার উপায় নেই। এমনকি সিটি করপোরেশন এখানে ড্রেন নির্মাণ করেছে, যার অর্ধেক অংশ নদীর ভেতরে। বর্জ্য ও বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাশনের ফলে এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

এদিকে নগরীর প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত শ্যামাসুন্দরী নদীর ১৭০ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হলেও উচ্ছেদ কার্যক্রম আটকে আছে। দখলদারদের মধ্যে ১১ জন আপত্তি জানানোয় অভিযান স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে শ্যামাসুন্দরী এখন আশীর্বাদ নয়, বরং নগরবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

নদীবিষয়ক গবেষক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, রংপুরের নদীগুলোর দুই পাড়েই ব্যাপক দখল রয়েছে। দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে রংপুর শহরের জলাবদ্ধতা কখনোই দূর হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights