আওয়ামী সরকারের ১,৭১২ কোটি টাকার অনিয়ম
অনলাইন ডেস্ক
প্রায় দেড় বছর কার্যক্রম বন্ধ। অডিটে এক হাজার ৭১২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ। দুদকের অনুসন্ধান চলছে। পরিকল্পনা কমিশনও প্রকল্পটি সমাপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রকল্পের মেয়াদই আবার দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সংশোধিত প্রস্তাবে অব্যয়িত ৫২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে নতুন কিছু কার্যক্রম যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ফলে দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২০ সালের জুলাইয়ে তিন হাজার ২০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। লক্ষ্য ছিল ৫১ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা।
অনুন্নত এলাকা ও হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে হার্ভেস্টারসহ ১২ ধরনের কৃষিযন্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে চাষাবাদের ব্যয় ২০ শতাংশ কমানো, কৃষিকাজে সময় ৫০ শতাংশ সাশ্রয়, ফসলের অপচয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা ও শ্রম দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু বাস্তবায়নের পথে প্রকল্পটি একের পর এক অনিয়মের অভিযোগে জড়িয়ে পড়ে। কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরের ২৬টি আপত্তিতে এক হাজার ৭১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় তিন হাজার ২০ কোটি টাকা হলেও জুন ২০২৫ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৪৯১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, অর্থাৎ মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৮২.৫০ শতাংশ।
এই সময়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৮১.০৭ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি প্রকল্পের কাজ।
ডিপিপির বাইরে অবৈধভাবে ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে অনুমোদিত প্রকল্পের বাইরে অবৈধভাবে করা ব্যয় নিয়ে। সংশোধিত আরডিপিপির ব্যয় বিভাজনে ‘ডিপিপি সংস্থান বহির্ভূত উন্নয়ন সহায়তা কার্যক্রমে অতিরিক্ত ব্যয়’ নামে ৩১২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সংস্থানের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত মূল প্রকল্পে যেসব কার্যক্রমের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল না, সেসব খাতে এরই মধ্যে যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, সেটি এখন সংশোধিত প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
প্রকল্পের টাকায় কোন খাতে কত ব্যয়
প্রস্তাবিত সংশোধিত ব্যয় বিভাজনেও বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। কর্মকর্তাদের বেতন ও ভাতাদি খাতে ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণ, উদ্বুদ্ধকরণ, ভ্রমণ ও কৃষি মেলার জন্য ৭৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, কর্মশালা ও সেমিনারে এক কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং স্থানীয় পরামর্শক ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিশেষজ্ঞের জন্য ৩৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
সমন্বিত যান্ত্রিক খামারে বীজ সহায়তা ও প্রযুক্তি প্রদর্শনী খাতে ব্যয় ২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। সরবরাহ ও সেবায় ১৮ কোটি এক লাখ টাকা এবং অনিয়মিত শ্রমিক মজুরিতে তিন কোটি ৯৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবহন ব্যয়ও বাড়িয়ে তিন কোটি ১২ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চতুর্থবার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা
নথিপত্রে দেখা যায়, প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব প্রথমে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি সমাপ্ত করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়।
এর পরও কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বন্ধ করতে রাজি হয়নি। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনা করেন। গত ১৯ জুনের আলোচনার পর কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রকল্পটি আরো দুই বছর চালানোর বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পটি আগের সচিব কোনোভাবেই আর চালাতে চাননি। তাই তিনি প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বলেন। কিন্তু প্রকল্পটির পরিচালক সেটি না করে এক বছরের ওপরে প্রকল্পটি শেষ না করে অনুমোদনবিহীন ঝুলিয়ে রাখেন। এখন নতুন সচিবের মাধ্যমে মন্ত্রীকে বুঝিয়ে প্রকল্প পরিচালক অনুমোদন চাচ্ছেন।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মঞ্জুর-উল আলমকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাঁর অফিসে গিয়েও তাঁর দেখা পাওয়া যায়নি।
অডিটে ১,৭১২ কোটি টাকার অনিয়ম
কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরের ২৬টি অডিট আপত্তিতে এক হাজার ৭১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ কম্বাইন হার্ভেস্টার বিতরণে।
অডিটে দেখা যায়, ৯৭১টি কম্বাইন হার্ভেস্টারের নামে ভর্তুকির বিল উত্তোলন করা হলেও মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ৮৫২ থেকে ৮৫৪টি হার্ভেস্টারের বিপরীতে একাধিকবার ভর্তুকির বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। শুধু এ দুই ধরনের অনিয়মেই সরকারের এক হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তদন্তেও প্রকল্পটির অনিয়মের প্রমাণ উঠে এসেছে। জুন ২০২০ থেকে মে ২০২৫ পর্যন্ত সংরক্ষিত বিল ও মাঠ জরিপের তথ্য এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমদানি তথ্যের সঙ্গে ১৩টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিতরণ করা যন্ত্রের হিসাব মিলিয়ে এসব অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। তদন্তে দেখা গেছে, কম্বাইন হার্ভেস্টার বিতরণ না করেই ৯৭১টির বিপরীতে ভর্তুকির বিল উত্তোলন করা হয়েছে। একই যন্ত্রের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে ৮৫২টি। এ ছাড়া স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ২০টি বিলের মাধ্যমে তিন কোটি আট লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পর প্রকল্প অফিস ও মাঠ পর্যায়ের ৯ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
কৃষকের লাভের বদলে ঋণের বোঝা
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো, শ্রমিকসংকট মোকাবেলা এবং আধুনিক কৃষিব্যবস্থার বিস্তার। কিন্তু বাস্তবে অনেক কৃষকের জন্য প্রকল্পটি আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী কিস্তিতে কৃষিযন্ত্র বিক্রির সুযোগ না থাকলেও বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কৃষকদের কাছ থেকে ডাউন পেমেন্ট নিয়ে কিস্তিতে কম্বাইন হার্ভেস্টার বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ। পরে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনেক কৃষকের কাছ থেকে যন্ত্র ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
‘প্রকল্প চলবে, দুর্নীতির বিচারও হবে’
এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘শ্রমিকসংকটের কারণে কৃষির উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। জমি প্রস্তুত, রোপণ, ফসল কাটা ও মাড়াই—সব ক্ষেত্রেই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে দ্রুত ফসল কাটতে যন্ত্র অপরিহার্য। প্রকল্পটি চলবে, যারা দুর্নীতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’
