আজ কি হতে চলেছে নতুন মহাতারকার রাজ্যাভিষেক?

অনলাইন ডেস্ক

স্পেনের তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্পেন কি এবার বিশ্বকাপ জিতবে? জবাবে কোনো দ্বিধা না রেখে সপ্রতিভ হাসিতে শুধু বলেছিলেন, হ্যাঁ। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএসের সঙ্গে কথা বলার সময় ১৯ বছর বয়সী এই তরুণের কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়েছিল, তা ফুটবল বিশ্বকে একটুও অবাক করেনি। কারণ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তবে ফুটবল বোদ্ধাদের একাংশের ধারণা ছিল, ইয়ামালের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করতে হলে চলতি বিশ্বকাপে তাকে নিজের সেরা রূপটা দেখাতে হবে। যদিও টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তার পারফরম্যান্স কিছুটা নিস্পৃহ। আসরে মাত্র একটি গোল করেছেন। অথচ তার দল স্পেন ঠিকই দাপটের সঙ্গে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। যেখানে রবিবারের ব্লকবাস্টার ফাইনালে নিউইয়র্কের মাঠে তাদের প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

চলতি বিশ্বকাপে যখন কিলিয়ান এমবাপ্পে, হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো তারকারা স্পটলাইট কেড়ে নিয়েছেন, সেখানে ইয়ামালের বিশ্বকাপ যাত্রা কেটেছে অপ্রত্যাশিতভাবে কিছুটা আড়ালে। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচটিই কি হতে যাচ্ছে তার সেই মহেন্দ্রক্ষণ? স্পেনের জার্সিতে ইয়ামালের পরিসংখ্যান এককথায় অবিশ্বাস্য। দেশের হয়ে খেলা ২৭টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একটিতেও হারের মুখ দেখেননি তিনি। বড় টুর্নামেন্টে শুরুর একাদশে থেকে টানা ১২টি ম্যাচ জিতেছেন, যা ইউরোপের যেকোনো ফুটবলারের জন্য একটি রেকর্ড। রবিবারের মেগা ফাইনালে তিনি যদি জালের দেখা পান, তবে পেলের পর মাত্র তৃতীয় টিনএজার হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার কীর্তি গড়বেন তিনি। আর স্পেন যদি শিরোপা জেতে, তবে ফুটবল ইতিহাসের চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার গৌরব অর্জন করবেন এই বার্সেলোনা তারকা।

ইয়ামালের এই পারফরম্যান্স নিয়ে অবশ্য স্প্যানিশ সমর্থকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এক খুঁদে ভক্তের মতে, ইয়ামাল গোল করলেন কি করলেন না, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না যদি স্পেন চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। বিশ্বকাপ জিতলে তিনি চিরকালের জন্য কিংবদন্তি হয়ে যাবেন, আর হেরে গেলে মানুষ হয়তো তার প্রথম বিশ্বকাপের কথা মনেই রাখবে না। তবে এই বয়সে বিশ্বকাপ জেতার সুযোগ বারবার আসে না, তাই ফাইনালে নিজের সেরাটা দিতে না পারলে ইয়ামালের মনে আজীবন আক্ষেপ থেকে যেতে পারে। যদিও চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা এই তরুণ গোল করা নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না। তার মূল লক্ষ্য দলকে জেতানো। গোল না পেলেও মাঠে তার ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে তটস্থ রাখছে। আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪৯ বার ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা করে ২২ বার সফল হয়েছেন তিনি, যা লিওনেল মেসির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

এই ফাইনালকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বে একটি বিশেষ আবহ তৈরি হয়েছে, যা মূলত লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামালের দ্বৈরথ। প্রায় ২০ বছর আগে পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালকে কোলে নিয়ে স্নান করাচ্ছেন ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি; এমন একটি দাতব্য ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তুলেছে। মেসির সঙ্গে ইয়ামালের তুলনা তাই অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল বার্সেলোনার হয়ে ১৫১টি ম্যাচ খেলে ফেলেছেন এবং মেসির সেই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সিটি গায়ে জড়িয়েছেন। যেখানে মেসির ১৯ বছর বয়সে বার্সার সিনিয়র দলে ম্যাচ খেলার সংখ্যা ছিল মাত্র ৪১টি। তবে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এই দুই তারকার তুলনাকে সম্পূর্ণ অনুচিত বলে মনে করেন। তার মতে, ইয়ামাল একজন জন্মগত প্রতিভাবান, যিনি মাঠে সম্পূর্ণ চাপহীনভাবে খেলতে পারেন।

বিশ্বকাপের ফাইনাল ঘিরে সবার নজর যেখানে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের দিকে, সেখানে স্পেনের জয় হলে তা হবে ফুটবলের ব্যাটন এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্প্যানিশ ক্রীড়া সাংবাদিক গিলেম বালাগ জানিয়েছেন, ইয়ামাল বর্তমানে তার পরিবারের সঙ্গে বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছেন, যদিও সম্প্রতি কাতালুনিয়ায় তার বাড়িতে চুরির একটি ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছিল। ইয়ামাল এখনো শতভাগ ফিট নন, তবে যখনই তিনি মাঠে নামেন, তার শৈশবের সেই মুক্ত ফুটবল খেলার আনন্দ ফুটিয়ে তুলতে চান। স্প্যানিশ শিবিরে ইয়ামালকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। দলের সবাই বিশ্বাস করেন, একা হাতে ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights