আধুনিক যুগে পুরোনো সংকটে শিক্ষার্থীরা

সৈয়দ নোমান, ময়মনসিংহ

জবাবদিহিতার অভাব৬৫ বছরের গৌরবময় যাত্রার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের পুরোনো সংকট কাটেনি। হলের ডাইনিং, পরিবহন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, উপবৃত্তি, লাইব্রেরি, সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা অভিযোগ। কোথাও অবকাঠামোগত ঘাটতি, কোথাও দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতা, আবার কোথাও তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাকৃবি দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ছয় দশকের বেশি সময়ে ৬১ হাজারের বেশি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে বর্তমান শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের গৌরবময় অর্জনের সঙ্গে ক্যাম্পাসের দৈনন্দিন সেবাব্যবস্থার চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হলের ডাইনিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ খাবারের মান, পরিমাণ ও স্বাদ নিয়ে। এ কারণে অনেকে বাইরে খেতে বাধ্য হচ্ছেন, এতে বাড়ছে মাসিক ব্যয়। ডাইনিংয়ে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতার ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর খাবারের মান কিছুটা উন্নত হলেও তা এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে যায়নি।

দীর্ঘদিনের পরিবহনসংকটও ভোগাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বিশাল ক্যাম্পাসে হল থেকে অনুষদ, লাইব্রেরি কিংবা টিএসসিতে যেতে অনেককে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয় অথবা অটোরিকশার ওপর নির্ভর করতে হয়। বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও নিয়মিত অভ্যন্তরীণ পরিবহনের ঘাটতি রয়েছে। শহরগামী বাসও প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়। উপবৃত্তির পরিমাণ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। তাদের দাবি, প্রায় তিন দশক ধরে স্টাইপেন্ড অপরিবর্তিত থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ফলে অনেকে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করছেন। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ল্যাব, ফিল্ড ভিজিট ও প্রয়োজনীয় উপকরণের খরচও অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা মিললেও জটিল রোগ বা দুর্ঘটনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও উন্নত সুবিধার সংকট রয়েছে। তখন শহরের হাসপাতালে যেতে হয়। জরুরি রেফারেল ও পরিবহনব্যবস্থার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যবিমা চালুর দাবিও রয়েছে। আবাসিক হলগুলোর অবকাঠামো নিয়েও অভিযোগ কম নয়। প্রায় ১০ তলা ভবনের বেগম খালেদা জিয়া হলে লিফট না থাকায় সিঁড়ি ব্যবহার করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

পুরোনো হলগুলোর পানি সরবরাহ ও ওয়াশরুমের সমস্যার পাশাপাশি ছাদের পানির ট্যাংক দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করার অভিযোগ রয়েছে। এতে ময়লা ও শ্যাওলাযুক্ত পানি সরবরাহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফজিলা-জব্বার-ফার্স্ট গেট সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় গর্ত, বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালুর কারণে দুর্ভোগ রয়েছে। পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সড়কটি সিটি করপোরেশনের আওতায় হওয়ায় সংস্কারে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ই-লাইব্রেরি ও ডিজিটাল সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি পরীক্ষার সময় আসনসংকট দূর করার দাবি রয়েছে। সাম্প্রতিক জার্নাল ও রেফারেন্স বইয়ের ঘাটতির অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা।

একই সঙ্গে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ও পরীক্ষায় হাতে লেখা পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক মূল্যায়নব্যবস্থা এবং বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানোর দাবি রয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে দুর্বলতা। হলগুলোর সামনে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে। শিক্ষা সফরে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাস বারবার ব্যবহারের প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। এ বিষয়ে বাকৃবির ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. জি এম মুজিবর রহমান বলেন, ডাইনিংয়ের মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদেরও সোচ্চার হতে হবে। অভ্যন্তরীণ যাতায়াত সহজ করতে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল চালুর প্রস্তাব পর্যালোচনায় রয়েছে। উপবৃত্তি বাড়াতে ইউজিসিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

হেলথ সেন্টারের উন্নয়নে কমিটি কাজ করছে এবং বেগম খালেদা জিয়া হলে শিগগিরই লিফট চালু হবে। তিনি বলেন, সড়ক সংস্কারে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। লাইব্রেরিতে আসন ও ডিজিটাল সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের বর্জ্য ফেলা এবং সিটি করপোরেশনের ময়লা অপসারণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সমস্যা হচ্ছে। হলের পানির ট্যাংকের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রভোস্টদের জানানো হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights