আমার কাছে চিঠি এলো ওপারে যাবার প্রিন্ট ভার্সন আমার কাছে চিঠি এলো ওপারে যাবার

আলাউদ্দীন মাজিদ

‘চিঠি এলো জেলখানাতে অনেক দিনের পর, হায়রে অনেক দিনের পর, এই দুনিয়া ছাড়তে হবে এসেছে খবর, হায়রে এসেছে খবর…। কারও কাছে চিঠি আসে বাবা-মায়ের, কারও কাছে প্রেমিকার। আমার কাছে চিঠি এলো ওপারে যাবার, হায়রে ওপারে যাবার।’ ছটকু আহমেদ পরিচালিত ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ ছবিতে সালমানের গাওয়া এই গানটি যে অল্প সময়ে সত্যি হয়ে যাবে তা কি কেউ ভুলেও কখনো কল্পনা করতে পেরেছিলেন! না, তারপরও গানটি সালমানের জীবনে অনাকাক্সিক্ষতভাবে সত্য হয়ে গেল। সালমান শাহকে বলা হতো ঢাকাই ুচলচ্চিত্রের সাফল্যের বরপুত্র। তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক। ঢালিউডের আকাশে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে এই ক্ষণজন্মা তারকার। প্রয়াণের আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন আন-প্যারালাল, চিরবিদায়ের পরেও হয়ে আছেন প্রবল জনপ্রিয় একজন নায়ক। সালমানের অভিনয় স্টাইল, পর্দায় তাঁর সপ্রতিভ উপস্থিতি আর নায়কোচিত ইমেজ আজও অন্য তারকাদের কাছে অনুকরণীয়। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান নির্মিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় তাঁর অভিষেক। শুরুতেই বিশাল সাফল্য দিয়ে সালমান প্রাণসঞ্চার করেন মৃতপ্রায় চলচ্চিত্রে। তারপর শুধুই ইতিহাস। সালমান শাহ মানে দর্শকের ভালোবাসা আর চলচ্চিত্রের জন্য আশীর্বাদ। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬। শুধুই সাফল্যের পথে হেঁটে যাওয়া। প্রয়াণের মাত্র কদিন আগে কথা প্রসঙ্গে অকাল-মৃত্যু নিয়ে সালমান শাহ বলেছিলেন, ‘শুধু আমার নয়, কারও ভাগ্যে যেন বিধাতা এমন মৃত্যু না লিখেন।’ বেঁচে থাকার জন্য যার আকুতি ছিল এমন, তিনি কী করে আত্ম অভিমানে নিজেকে সংহার করবেন। এমন প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। সালমান ছিলেন অভিনয়ে, আছেন হৃদয়ে, থাকবেন অনন্তকাল। সালমানের মৃত্যু নেই। আজ তাঁর চিরপ্রস্থানের ৩০তম বার্ষিকী। তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

চিঠিস্বল্প সময়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ

১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় ‘কথার কথা’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ শিরোনামের একটি গানের মিউজিক ভিডিওতে হানিফ সংকেতের কণ্ঠে গাওয়া গানের প্রধান চরিত্র অপূর্বর ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ মিডিয়ায় প্রথম আলোচিত হন। তখন তিনি ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন। এর কয়েক বছর পর আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় ‘পাথর সময়’ নাটকে এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছিলেন। মাত্র চার বছরের অভিনয় জীবনে ২৭টি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র, কিছু দর্শকপ্রিয় নাটক, টেলিফিল্ম এবং বিজ্ঞাপনে মানসম্মত কাজ করে গেছেন সাফল্যের এই বরপুত্র। দুটি চলচ্চিত্রে শ্রতিমধুর গানও গেয়েছেন।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্যাশন আইকন

মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমার নায়ক সালমান শাহ। আর এসব সিনেমায় সালমান শাহ ফ্যাশন নিয়ে যে পথ দেখিয়ে গেছেন, দীর্ঘ বহু বছরে ঢাকাই সিনেমার আর কোনো নায়ক তা করতে পারেননি। সালমান শাহের মৃত্যুর পর সিনেমার আর কোনো তারকা এখনো ভক্তদের ‘ফ্যাশন আইকন’ হয়ে উঠতে পারেননি। ১৯৯৩ সালে প্রথম ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায়ই ফ্যাশনে ভিন্নতা দেখিয়েছিলেন সালমান। ওই সিনেমায় তিনি মাথায় ভিন্ন স্টাইলের ক্যাপ পরেছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সিনেমায় সালমানের ফ্যাশনের তালিকায় ছিল মাথায় রংবেরঙের টুপি, স্ট্রিচ জিন্স প্যান্টের হাঁটুতে রুমাল বাঁধা, ছোট চিপের ব্যাকব্রাশ করা চুলের ডিজাইন, চুল ঝুঁঁটি করা, কানে দুল, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, টি-শার্টের সামনের দিকে ইন করে পেছনের দিকে একটু খুলে রাখা, বড় বকলেসওয়ালা বেল্ট পরা, ডান হাতে ঘড়ি পরা, কপাল ঢেকে রাখা ব্যান্ডেনা, গলায় আরবীয় রুমাল প্যাঁচানো, পুলিশি পোশাক ও টুপিতে রোদচশমা আর গোঁফ, দাঁত দিয়ে নখ কাটা, বড় চুলে ঠোঁটের কোণে সিগারেট রাখাসহ এমন অসংখ্য নিজস্ব স্টাইল তৈরি করেছিলেন সালমান। চুলের স্টাইলেও এনেছিলেন পরিবর্তন। সে সময় নতুন সিনেমা মুক্তির সঙ্গে সালমানের নিত্যনতুন স্টাইল দেখে পাড়া-মহল্লায় তরুণদের মধ্যে তাঁকে ফলো করার হিড়িক পড়ে যেত। সালমানের মতো স্টাইলে চুল রাখত তাঁর ভক্তরা, পরত গোল ফ্রেমের চশমা, বিভিন্ন রঙের টুপি। এ ছাড়া কপাল ঢেকে রাখা ব্যান্ডেনা ও স্ট্রিচ জিন্স প্যান্টের হাঁটুতে রুমাল বাঁধা নব্বই দশকে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সালমানের জন্যই।

ভালোবাসার স্বাক্ষর

সালমানের ভক্তকুলের অভাব নেই। এখনো অনেক ভক্ত তাঁকে ভালোবেসে অনেক কিছু তৈরিও করেছেন। তাঁর নামে ধামরাইয়ের ফিল্ম ভ্যালিতে হয়েছে শুটিং ফ্লোর। গাজীপুর সিটিতে তাঁর নামে হয়েছে বাসস্ট্যান্ড; তৈরি হয়েছে ভাস্কর্য। সালমান শাহর সবচেয়ে সুপারহিট সিনেমা ‘স্বপ্নের ঠিকানা’। এই সিনেমাটির নামে তাঁর ভক্ত মো. রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ খান) নির্মাণ করেছেন একটি রিসোর্ট। যেখানে তৈরি হয়েছে সালমানের একটি নান্দনিক ভাস্কর্য। গাজীপুরের উলুখোলায় বীরতুল উত্তরপাড়ায় সালমানের এই ভাস্কর্যটি স্থাপিত হয়।

২৩ তরুণীর আত্মহত্যা

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা হার্টথ্রব নায়ক সালমানের অকালমৃত্যুর খবর কেউ মেনে নিতে পারেননি। শোনা যায়, সালমান খানের মৃত্যুর খবর শুনে অন্তত ২৩ জন তরুণী আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর নজরুল নামে এক বন্ধু ছিল। সালমান খান মারা যাওয়ার পর সে শুধু পাগলের মতো এফডিসির সামনে ঘুরে বেড়াত। ফারুক নামে আরেকজন বন্ধু ছিল। সেও কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

মজার ঘটনা

একবার একটি মেয়ে কলেজ ফাঁকি দিয়ে এসেছে সালমানের সঙ্গে দেখা করার জন্য। সে তাঁর ফ্ল্যাটের নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। সালমান তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন কেন কলেজ ফাঁকি দিয়ে এসেছে সে। তারপর মেয়েটিকে চলে যেতে বললেন। আর এতে রাগ হয়ে মেয়েটি তাঁর সামনেই ব্লেড দিয়ে তার একটি হাত কেটে ফেলল। সালমান যতক্ষণ এফডিসিতে থাকতেন, গেটের বাইরে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষায় থাকত তাঁকে একবার দেখার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights