আরাকান আর্মির ফাঁদে পাহাড়ি তরুণ

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

আরাকান আর্মির ফাঁদে পড়ছেন পাহাড়ি তরুণ-যুবকরা। নতুন স্বাধীন দেশে লোভনীয় চাকরির আশ্বাসে ছুটছেন তাঁরা। পার্বত্যাঞ্চলের দুর্গম পাহাড় থেকে শত শত তরুণ-যুবক হারিয়ে যাচ্ছেন নিঃশব্দে। তাঁদের গন্তব্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। সেখানে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’। এ গোষ্ঠী এখন চরম জনবল সংকটে পড়েছে। টার্গেট করা হচ্ছে বান্দরবান, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-যুবকদের। তাদের দলে টানতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এজেন্ট। গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডেকেট। স্থানীয় দালালদের দেওয়া এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা ও মাসিক বেতনের টোপ গিলছেন অনেকে। দুই বছরে অন্তত ৪০০ যুবক সীমান্ত পার হয়েছেন। যোগ দিয়েছেন ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীতে। সীমান্তের ওপারে গড়ে উঠেছে গোপন নিয়োগবাণিজ্য। বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণকে ভালো চাকরি ও নানান প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার তথ্য আমাদের কাছেও রয়েছে। তারা সেখানে যুদ্ধ না-কি অন্য কাজ করছে- তার শতভাগ সঠিক তথ্য নেই। অবৈধ উপায়ে রাখাইনে যাওয়া ঠেকাতে দেশের সব কটি সংস্থা সমন্বয় করে কাজ করছে।

কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ইতোমধ্যেই আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছে। অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, অভিযানে আমরা বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি পাহাড়ি যুবক ও তরুণকে আটক করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা এ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তাঁদের স্থানীয় থানায় সোপর্দ করা হয়। বর্তমানে মামলাগুলো পুলিশ তদন্ত করছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশি উপজাতি গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মি সমগোত্রীয়। তাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক আচার-আচরণও অভিন্ন। তাই আরাকান আর্মির সদস্যদের প্রতি বাংলাদেশি উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর আলাদা প্রীতি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেকার যুবকদের হতাশা। এগুলোকে পুঁজি করেই আরাকান আর্মি দলে ভেড়াচ্ছে উপজাতি যুবক তরুণদের। তাদের রাখাইনে যাওয়া ঠেকাতে সরকারের উচিত উপজাতি নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়া।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আরাকান আর্মিতে যোগ দেওয়ার ভয়ংকর চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নাইক্ষ্যংছড়ির ৩৪-পিলার সীমান্ত এলাকা থেকে তিন সদস্যকে আটক করে বিজিবি। তাঁরা সবাই বাংলাদেশি মার্মা সম্প্রদায়ের যুবক। তারা হলেন- রাঙামাটির রাজস্থলীর উয়ইমং মার্মা, বান্দরবানের রুমার হলাচিং থোয়াই মার্মা ও গরাইমং মার্মা। তাঁদের কাছ থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার মিয়ানমার কিয়াট জব্দ করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত থেকে আরাকান আর্মির দুই সদস্যকে আটক করে বিজিবি। তাঁদের একজন রাঙামাটি সদরের নয়ন চাকমা। বিজিবি জানায়, তাঁরা আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য। একই বছরের ২৩ মার্চ কক্সবাজারের খুরুশকুল তেতৈয়া ঘাট এলাকায় বড় অভিযান চালায় র‌্যাব-১৫। সেখান থেকে আরাকান আর্মির ৬০ জোড়া ইউনিফর্মসহ তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন- শফিকা আকতার, মিনুয়া আকতার ও এক কিশোর।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্ত এখন জান্তা বাহিনীর হাতছাড়া। সংগঠনটির প্রধান কমান্ডার তোয়ান ম্রাত নাইংয়ের লক্ষ্য ২০২৭ সাল। এ সময়ের মধ্যে তিনি রাখাইন রাজ্যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান। বর্তমানে তীব্র জনবল সংকটের কারণে আরাকান আর্মি নজর দিয়েছে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে। টার্গেট বান্দরবান, রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলা এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ। এসব এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর যুবকদের দলে টানতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এজেন্ট। তারা পাহাড়ি এলাকার সহজ-সরল ও বেকার যুবকদের প্রলোভন দেখাচ্ছেন। দিচ্ছেন উন্নত জীবন ও উচ্চ বেতনের আশ্বাস। রাখাইন স্বাধীন হলে সরকারি চাকরির টোপও দেওয়া হচ্ছে। এ ফাঁদে পা দিচ্ছেন অনেকেই।

জানা যায়, সীমান্ত পার হতে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের অন্তত ২০টি পয়েন্ট ব্যবহার করছে আরাকান আর্মি। এর মধ্যে টেকনাফ উপজেলার ১১টি পয়েন্ট রয়েছে। এগুলো হলো- চাকমারকুলের কোয়ানচিবন, হোয়াইক্যংয়ের ডেউবুনিয়া, উনচিপ্রাংয়ের খোয়ারহালী এবং কাঞ্জরপাড়ার শালখালী। আরও আছে জীম্মনখালীর জিয়ানহালী, নয়াবাজারের কুয়ারবিল, হ্নীলার নাখপুরা, মুছনীর রাম্মাঘোনা, জাদীমুড়ার রংগাদন, নাইট্যংপাড়ার পেরানপুরু ও ঘোলার পাড়ার মন্নিপাড়া। উখিয়া উপজেলার ৪টি পয়েন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো হলো- ভালুখিয়ার শিকদারপাড়া, বাইশপাড়ির নারাইনশন, খাইনখালীর চাকমাকাটা এবং পালংখালীর লাম্মনহালী। এ ছাড়া বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বেশ কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়েও পারাপার চলছে। এর মধ্যে ফুলতলী, লম্বাশিয়া, ভালুরখাইয়া, চাকঢালা, দোছড়ি, উত্তরপাড়া এবং বাইশফাঁড়ি অন্যতম।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-যুবকদের রাখাইনে যাওয়ার বিষয়ে কথা হয় নাইক্ষ্যংছড়ির ছয়জন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা দোছড়ি, সোনাইছড়ি, ঘুমধুম ও বাইশারী ইউনিয়নের প্রতিনিধি। তাঁদের দাবি, দুই বছরে শুধু নাইক্ষ্যংছড়ি থেকেই কয়েক শ যুবক অবৈধভাবে রাখাইনে গেছেন।

জানা গেছে, পাহাড়ি তরুণদের ওপারে পাঠাতে সীমান্তে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এ সিন্ডিকেট পাহাড়ি যুবকদের এককালীন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিচ্ছেন। পরে মাসিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে রাখাইনের আরাকান আর্মি ক্যাম্পে পাঠাচ্ছেন। সেখানে তাঁদের স্বল্পমেয়াদি অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এরপর নামানো হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধে অংশ নেওয়া যুবকদের পরিবারকে নিয়মিত মাসিক ভাতা দিচ্ছে আরাকান আর্মির এজেন্টরা। ওপারে থাকা তরুণদের সঙ্গে পরিবারের ফোনে কথা বলার ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে এ কথিত এজেন্টরাই।

চলতি বছরের জুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। খবরটি ছিল, রাখাইনে যুদ্ধ করতে গিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ির এক পাহাড়ি যুবক নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম শুলু মার্মা ওরফে মংনু মার্মা। তিনি বাইশারী ইউনিয়নের পশ্চিম বাইশারী গুদাম পাড়ার মিংগা মার্মার ছেলে। অবশ্য তাঁর মৃত্যুর খবর পরিবার বা প্রশাসন কেউই স্বীকার করেনি। স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগে শুলু মার্মা আরাকান আর্মিতে যোগ দেন। তিনি সংগঠনটির মংডু এলাকার কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। কিছুদিন আগেও তিনি গোপনে বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। তবে বর্তমানে তাঁর আসা-যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights