ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজিলত

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

মাহে রমজান মুমিনের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের বসন্তকাল। এ মাসের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে সিক্ত থাকে। বিশেষত, রমজানের শেষ দশক অত্যধিক মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই দশকেই আছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ লাইলাতুল কদর।
এই মহিমান্বিত সময়কে যথাযথভাবে ধারণ করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল হলো ইতিকাফ। এটি এমন এক ইবাদত, যা মানুষকে জাগতিক কোলাহল থেকে সরিয়ে এনে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিবিষ্ট করে।

আত্মশুদ্ধির মাধ্যম ইতিকাফ : ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য নিজেকে আল্লাহমুখী করা। সাধারণ জীবনে মানুষ নিজের সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য, দায়িত্ব, কর্তব্য ও নানা চিন্তায় নিমগ্ন থাকে।

ইতিকাফ তাকে সাময়িকভাবে সব ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যে নিয়ে আসে। এ সময় ইতিকাফকারী ব্যক্তি কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া, নফল নামাজ প্রভৃতিতে নিজেকে নিমগ্ন রাখেন। ফলে অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, তাকওয়া বৃদ্ধি পায় এবং মহান রবের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় ও মজবুত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন।

ইতিকাফ ছিল নবীজির নিয়মিত আমল। সাহাবায়ে কেরামও গুরুত্বের সঙ্গে ইতিকাফ পালন করেছেন। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক রমজানে শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৪৪)

ইতিকাফের ফজিলত : ইতিকাফকারীর জন্য হাদিস শরিফে অনেক সুসংবাদ ও ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—

জান্নাতের প্রতিশ্রুতি : আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মসজিদ হলো প্রত্যেক মুত্তাকির (খোদাভীরু ব্যক্তির) ঘর।

আর যার ঘর মসজিদ, আল্লাহ তাআলা তার জন্য প্রশান্তি, রহমত বর্ষণ এবং নিরাপদে পুলসিরাত পার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।’ (সহিহুত তারগিব, হাদিস : ৩৩০)

হজের সওয়াব : হোসাইন ইবনে আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে যে ব্যক্তি ইতিকাফ করবে, সে দুটি হজ অথবা ওমরার সওয়াব পাবে।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৯৬৬)

ক্ষমার ঘোষণা : আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় ইতিকাফ করবে, তার পেছনের সব (ছগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (জামে সগির, হাদিস : ১২২৩০)

জাহান্নামের দূরত্ব : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এক দিন ইতিকাফ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ও জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করে দেবেন, প্রত্যেক পরিখার দূরত্ব হবে দুই দিগন্তের চেয়েও বেশি।’ (মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৭৩২৬)

এক দিনের ইতিকাফের ফজিলত যদি এমন হয়, তাহলে পুরো ১০ দিনের ইতিকাফ কত মহান ফজিলতের, তা সহজেই অনুমেয়।

রমজানের শেষ দশকের ইতিকাফ নিঃসন্দেহে মহামূল্যবান ইবাদত। এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া অর্জন ও লাইলাতুল কদরের ফজিলত ও বরকত লাভের মূল্যবান সুযোগ। ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও যদি আমরা অন্তত এ দশকটুকু আল্লাহ তাআলার ঘর মসজিদে কাটানোর দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করি, তবে তা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের জন্য কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে ইতিকাফ পালনের তাওফিক দান করুন এবং লাইলাতুল কদরের অগণিত রহমত থেকে আমাদের বঞ্চিত না করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights