ইরান যুদ্ধ থেকে যে বড় শিক্ষা নিচ্ছে চীন: সিএনএন’র বিশ্লেষণ

অনলাইন ডেস্ক
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই দুই দেশই অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জামের অধিকারী। হামলার শুরুতেই ইরানের বহু সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। এতে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এছাড়াও স্কুলে হামলা চালিয়ে অন্তত ১৭০ শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। গোটা দেশ যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

তবে চুপ করে বসে থাকেনি ইরানও। তৎক্ষণাৎ পাল্টা হামলা শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায়। এতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়। সেই সঙ্গে বন্ধ করে দেয় বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে দেখা দেয় অস্থিরতা। গোটা দুনিয়াকে ঠেলে দেয় অর্থনৈতিক মন্দার দিকে।

টানা ৩৯ দিন ধরে এই যুদ্ধ চলে। অবশেষে গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসে দুই দেশ। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়।

পরবর্তীতে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে সেটিকে এক রকম একক সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্প্রসারিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর থেকে পাকিস্তানের মাধ্যমে শান্তিচুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অচলাবস্থা কাটেনি।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীন বড় শিক্ষা নিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

তারা মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও আধুনিক যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে চীনের সামনে নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে গত কয়েক মাসের সংঘাত ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষ- বিশেষ করে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে- কী রূপ নিতে পারে, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে চীন, তাইওয়ান ও অন্যান্য দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরান যুদ্ধ চীনকে যেমন আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করছে, তেমনি নিজেদের সামরিক দুর্বলতা সম্পর্কেও সতর্ক করছে।

চীনের সাবেক বিমানবাহিনী কর্নেল ফু চিয়ানশাও বলেন, এই যুদ্ধ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- শুধু আক্রমণাত্মক শক্তি বাড়ালেই হবে না, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সমান শক্তিশালী হতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, ইরান তুলনামূলক কম প্রযুক্তির শাহেদ ড্রোন ও স্বল্পমূল্যের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁক খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছে।

তার ভাষায়, “ভবিষ্যতের যুদ্ধে অজেয় থাকতে হলে আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।”

দ্রুত বাড়ছে চীনের সামরিক শক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ব্যাপকভাবে আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, স্টেলথ প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান এবং দীর্ঘপাল্লার হামলা সক্ষম অস্ত্রভাণ্ডারে দ্রুত উন্নতি করেছে দেশটি।

ব্রিটিশ থিংকট্যাঙ্ক রুসির তথ্যমতে, চীনের বিমানবাহিনী দ্রুতগতিতে পঞ্চম প্রজন্মের জে-২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমান যুক্ত করছে, যা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সমতুল্য। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বা বি-২১ বোমারুর মতো দীর্ঘপাল্লার স্টেলথ বোমারু বিমান তৈরির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।

তাইওয়ান ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ
সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতে তাইওয়ানকে সবচেয়ে বড় ফ্ল্যাশপয়েন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানের সঙ্গে ‘পুনঃএকত্রীকরণ’ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথাও উড়িয়ে দেননি।

তাইওয়ানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন এখন এমন একটি সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছে, যা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চপ্রযুক্তির নির্ভুল হামলা চালাতে সক্ষম, অন্যদিকে ইরানের মতো কম খরচের বিপুলসংখ্যক ড্রোন যুদ্ধেও কার্যকর হতে পারে।

তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক চিয়েহ চুং বলেন, “তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য চীনা সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার রকেট ও ড্রোনের ঝাঁক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ড্রোন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীন বছরে বিপুলসংখ্যক অস্ত্রসজ্জিত ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের বেসামরিক কারখানাগুলো এক বছরের কম সময়ে নিজেদের রূপান্তর করে বছরে প্রায় ১০০ কোটি যুদ্ধড্রোন উৎপাদন করতে পারে।

অন্যদিকে, তাইওয়ানের সামরিক ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনও ‘অকার্যকর’ বলে সতর্ক করেছে দেশটির সরকারি পর্যবেক্ষণ সংস্থা। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানানো হয়।

যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে ড্রোন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার আক্রমণকারী পক্ষের জন্য যুদ্ধকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান স্যামুয়েল পাপারো সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে বলেন, তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত হলে হাজার হাজার ড্রোন ব্যবহার করে চীনা যুদ্ধজাহাজ ও সেনা পরিবহন বিমান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচের ড্রোন দিয়ে ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজ বা যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার এই কৌশল ইরান যুদ্ধেও দেখা গেছে। ইরানের অসম যুদ্ধকৌশলের আশঙ্কায় মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে সীমিত উপস্থিতি বজায় রেখেছে।

অভিজ্ঞতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক অস্ত্রের পাশাপাশি বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও বড় বিষয়। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধের পর চীনের সেনাবাহিনী বড় কোনও যুদ্ধে অংশ নেয়নি। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন যুদ্ধে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

চীনা সামরিক বিশ্লেষক সং জংপিং বলেন, “ইরান সংঘাত দেখাচ্ছে প্রকৃত যুদ্ধ কেমন হয়।”

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা শুধু যুদ্ধই করেনি, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত কৌশল বদলের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের মধ্যে পড়ে চীনের সেনাবাহিনী কত দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তা এখনও অজানা।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে- আঞ্চলিক সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানকে ঘিরে ভবিষ্যতে কোনও সংঘাত শুরু হলে তা শুধু সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights