ইসরায়েলের উসকানিতে ইরান ফাঁদে পা, বড় বিপদে আমেরিকা!

অনলাইন ডেস্ক
চলতি বছরে নিউইয়র্ক টাইমসের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের চরম ব্যর্থতা এবং এর পেছনে থাকা গভীর ষড়যন্ত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে। প্রতিবেদনে জানা গেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানে শাসন পরিবর্তনের প্রলোভন দেখিয়ে মার্কিন প্রশাসনকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল। সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এই কথা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, মাত্র চার দিনের মধ্যে তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে।

এই তথাকথিত সর্বজ্ঞানী ও সর্বশক্তিমান ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের উৎস নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকরা বলছেন, ইসরায়েল আসলে তাদের নিজস্ব কোনো নিরেট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই পরিকল্পনা করেনি। বরং তারা মার্কিন থিংক ট্যাংকগুলোর তৈরি করা বানোয়াট তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল, যা নিউইয়র্ক টাইমসের মতো প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো ফলাও করে প্রচার করে থাকে। এই থিংক ট্যাংকগুলোতে থাকা ‘ইরান বিশেষজ্ঞ’ নামধারী একদল ব্যক্তি মূলত তাদের নিয়োগকর্তাদের খুশিমতো মনগড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এই ধরনের দেশীয় তথ্যদাতার ব্যবহারের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের প্রেক্ষাপট লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আহমেদ চালাবি এবং কানান মাকিয়ার মতো ব্যক্তিরা ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়েছিলেন। সেই সময় জুডিথ মিলারের মতো সাংবাদিকরা নিউইয়র্ক টাইমসের পাতায় সেসব খবর প্রকাশ করে যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। পরবর্তীতে সময় প্রমাণ করেছে যে, সেই সব তথ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কেবল আগ্রাসনের অজুহাত তৈরির জন্যই তা সাজানো হয়েছিল।

বর্তমানে ঠিক একই চিত্রনাট্য মঞ্চস্থ হচ্ছে ইরানের ক্ষেত্রে এবং এখানে মূল চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সাবেক শাহজাদা রেজা পাহলভি। কয়েক দশক আগে ইরান ছেড়ে যাওয়া এই ব্যক্তি বর্তমানে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও থিংক ট্যাংকগুলোর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন। তাকে সামনে রেখেই ইরানে গণতন্ত্র ফেরানোর নামে আসলে একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, রেজা পাহলভি বর্তমান ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তাকেই পরিবর্তনের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং সাংস্কৃতিক প্রোপাগান্ডা। আজার নাফিসির ‘রিডিং ললিতা ইন তেহরান’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিল ইরানকে দানবীয় রূপে উপস্থাপনের প্রথম ধাপ। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম তত্ত্বের উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমানে এরিয়া স্টাডিজ বা আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো সাম্রাজ্যবাদী জ্ঞান তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো মার্কিন কৌশলবিদদের সেই তথ্যই সরবরাহ করে যা তারা শুনতে চায়, প্রকৃত বাস্তবতাকে তারা সুকৌশলে এড়িয়ে যায়।

হোভার ইনস্টিটিউশন, হেরিটেজ ফাউন্ডেশন বা আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মতো থিংক ট্যাংকগুলো এখন বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত প্রবাসী ইরানিরা নিজেদের জন্মভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ভুল গোয়েন্দা তথ্য পরিবেশন করছে। তাদের লক্ষ্য কেবল ইরানের শাসন পরিবর্তন নয়, বরং ইসরায়েলি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। এই প্রক্রিয়ায় তারা যেমন ইরানের সাধারণ মানুষের শত্রু, তেমনি তারা মার্কিন জনগণেরও স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করছে কারণ এর ফলে আমেরিকা একটি অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইরানে সাধারণ মানুষ যুদ্ধের এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি চাইছে। ৯০ কোটির বেশি ইরানি এবং ৩০ কোটিরও বেশি আমেরিকান এখন এই ‘গান-ফর-হায়ার’ বা ভাড়ায় খাটা তথ্যদাতাদের স্বরূপ চিনতে পারছে। যারা নিজের মাতৃভূমিকে বিদেশি সেনাবাহিনী দিয়ে ধ্বংস করতে প্ররোচিত করতে পারে, তারা তাদের আশ্রয়দাতা দেশের প্রতি কতটুকু অনুগত হবে তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। এই প্রবাসী অপশক্তিগুলো আসলে দেশপ্রেমের আবরণে নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, বছরের পর বছর ধরে বিপজ্জনক মিথ্যা প্রচার করার জন্য এই চক্রটিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের ছড়িয়ে দেওয়া ভুল তথ্যের কারণে আজ ইরান এবং আমেরিকা উভয় দেশের নিরাপত্তা ও শান্তি হুমকির মুখে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি রক্ষায় এবং একটি স্বাধীন ভবিষ্যতের জন্য এই ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ত গোয়েন্দা তথ্য এবং তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এই স্বীকারোক্তি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের এক ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র।

মিডলইস্ট আই’র বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights