ঈদকে ঘিরে বগুড়ার দই বিক্রিতে শতকোটি টাকার বাণিজ্য

ঈদকে ঘিরে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী দইয়ের বাজারেও ছড়িয়েছে উৎসবের আমেজ। ঈদের ছুটিতে নানা সামাজিক আয়োজন ও পর্যটকদের আগমনে দইয়ের জেলা বগুড়ায় বিক্রি হয়েছে প্রায় শতকোটি টাকার দই ও মিষ্টি। শুধু দইকে কেন্দ্র করেই বগুড়া পেয়েছে নতুন পরিচিতি। দীর্ঘদিন ধরেই এ জেলার দই সুনাম কুড়িয়েছে দেশ-বিদেশে। স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় এই জেলার দই দিন দিন আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে জেলায় দই-মিষ্টির চাহিদা দ্বিগুণ বেড়েছে।

২০২৩ সালের ২৬ জুন বগুড়ার দই ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি লাভ করে। যা এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটির মর্যাদা আরো বাড়িয়ে দেয়।

তবে দাম নিয়ে ক্রেতাদের কিছুটা অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, দুধের সংকট বা উচ্চমূল্যের কারণে অনেক দোকানি ঈদের সময় দইয়ের দাম কিছুটা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের মৌসুমে দুধের চাহিদা থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এছাড়া দইয়ের কাঁচামালের চাহিদা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় অতিরিক্ত শ্রমিক ব্যয়। যে কারণে প্রতি হাড়ি ২০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এবারের ঈদে রেকর্ড বিক্রির মধ্য দিয়ে দইয়ের বাজার নতুন মাত্রা পেয়েছে।

তারা জানান, ঈদ মৌসুমে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, ঈদ পুনর্মিলনী এবং উপহার আদান-প্রদানের ফলে দইয়ের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, জেলার বাইরে কর্মরত ব্যক্তিরাও পরিচিতজনদের জন্য বগুড়ার দই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের দিন থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় শতকোটি টাকার দই ও মিষ্টি বিক্রি হয়েছে।

জানা যায়, বগুড়াকে দই’র শহর বলা হয়। এ কারণে দেশ-বিদেশে চাহিদা প্রচুর। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত মানুষ তাদের নিজ বাড়িতে ছুটে এসেছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ উদযাপন করছেন। তাই ঈদের সপ্তাহজুড়ে প্রায় শত কোটি টাকার দই-মিষ্টি বেচা-কেনা হয়েছে। শুধু বগুড়ার ক্রেতারাই নয় এই জেলায় যারা বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন তারাও আপনজনদের জন্য দই-মিষ্টি কিনেছেন। এছাড়া আত্মীয়তার বন্ধন আরো গভীর করতে একে অপরের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন বগুড়ার সুস্বাদু দই ও মিষ্টি। জেলার ১২টি উপজেলায় বর্তমানে সহস্রাধিক দইয়ের দোকান রয়েছে। যার মধ্যে শুধু বগুড়া শহর ও আশপাশেই রয়েছে প্রায় ৩০০টি দোকান। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও গড়ে উঠেছে ছোট-বড় বহু দই কারখানা।

দইয়ের শুরুটা হয়েছিল বগুড়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলায়। কথিত আছে, ১৮৬০ বা ১৮৭০ সালের দিকে প্রথম দই উৎপাদন হয়। কালক্রমে আবারো দই তৈরী করেন শেরপুর উপজেলার গৌর গোপাল পাল নামের এক ঘোষ পরিবারের সদস্য। তখন দই সম্পর্কে সবার ভালো ধারনা ছিলোনা। গৌর গোপালের এই দই’ই ধীরে ধীরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবার ও সাতানী পরিবারের কাছে এ দই সরবরাহ করতেন গৌর গোপাল। সে সময়ে এই দইয়ের নাম ছিল নবাববাড়ীর দই। নবাবী আমলে বিশেষ খাবার ছিল এই দই। কালে কালে দিন গড়িয়ে গেলেও এখনো বিশেষ খাবার হিসেবে ধরে রেখেছে দই। বিয়ে, জন্মদিন, ঈদ, পূজা, আকিকা হালখাতা বা পারিবারিক যে কোন অনুষ্ঠানে দই বিশেষ খাবার হিসেবে পরিবেশিত হয়ে থাকে।

স্বাধীনতার পর বগুড়ায় দই তৈরিতে শহরের গৌর গোপালের পাশাপাশি মহরম আলী ও বাঘোপাড়ার রফাত আলীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ছোট ছোট মাটির পাত্রে (স্থানীয় ভাষায় হাড়ি) দই ভরানো হতো। ঘোষদের ছোট ছোট দোকান থাকলেও তখনও ফেরি করেই দই বিক্রি হতো। পরবর্তী সময় থেকে বগুড়া শহরের কবি নজরুল ইসলাম সড়কের এশিয়া সুইট মিট ও দইঘর, শ্যামলী হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট দইঘর, ফুড ভিলেজ এর দই, রুচিতা, ঠনঠনিয়ার দইওয়ালা, দই বাজার, মিষ্টিমহল দইঘর, মহরম আলী, শেরপুর দই ঘর, চিনিপাতাসহ শতাধিক শো রুমে দই-মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে। আবার শহরের বাইরে বাঘোপাড়ার রফাত দই ঘর, শেরপুরের রিপন দধি ভান্ডার, সাউদিয়া, জলযোগ, শম্পা, বৈকালী ও শুভ দধি ভান্ডার থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমানে দই-মিষ্টি বিক্রি হয়। এছাড়া বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া ঢাকাগামী বাসস্ট্যান্ডে রয়েছে ৭টি ভিন্ন নামের দইয়ের শো’রুম। ঈদকে ঘিরে এসব দোকানে প্রায় শত কোটি টাকার দই বিক্রি হয়েছে। ঐতিহ্য আর স্বাদের মিশেলে বগুড়ার দই যেন হয়ে উঠেছে ঈদের অনিবার্য এক উপকরণ।

বগুড়ার দই ব্যবসায়ীরা জানান, বগুড়ায় বিভিন্ন ব্রান্ডের দই পাওয়া যায়। ছোট বড় বিভিন্ন আকৃতির মাটির পাত্রে দই ভরানো হয়। আগে কেজি হিসেবে দই বিক্রি হলেও এখন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দই বিক্রি হয় প্রতি পিছ হিসেবে। বগুড়া শহরের এশিয়া সুইট মিট ও দইঘরে স্পেশাল দই ৩৪০টাকা, শাহী দই ৪০০টাকা, সাদা দই ৩০০টাকা, টক দই ২০০টাকা, বড় ক্ষীরসা ৭০০টাকা, ছোট ক্ষীরসা ৩৫০টাকা, হাড়ি দই ৫০০টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বগুড়া শ্যামলী হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট এর জেনারেল ম্যানেজার জামিল খান জানান, বগুড়ায় ঈদকে ঘিরে দই-মিষ্টির চাহিদা প্রচুর। বেচা-কেনা ভালো হয়েছে। বগুড়ার তৈরী দই দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে কোন বিদেশি বেড়াতে এলে তারা ফেরার সময় দই কিনে নিয়ে যান। হাতে হাতে করেই এই দই পৌঁছে যায় বিভিন্ন দেশে।

দই কিনতে আসা সেলিম প্রামানিক জানান, অনেক দোকানি ঈদের সময় দইয়ের দাম কিছুটা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights