ক্রিকেটের সেই গৌরবগাথা দিন

আসিফ ইকবাল

আজ ঐতিহাসিক ১৩ এপ্রিল। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিকার ১০৩ দিন। নানা ঘটনা ও দুর্ঘটনায় ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে দিনটি। বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বলতম দিন আজ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালের এই দিনে। ১৯১৯ সালের এই দিনে ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’ হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। উপমহাদেশের ইতিহাসে যা অন্যতম ঘৃণিত এক দিন। রাওলাট আইনের প্রতিবাদে পাঞ্জাবের অমৃতসরে এক বিক্ষোভ সমাবেশে জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশ গুলি চালালে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। দিনটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের সোনার হরফে লেখা উজ্জ্বলতর দিন। আজ থেকে ২৯ বছর আগে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামুপরের কিলাত ক্লাব মাঠে লেখা হয়েছিল ক্রিকেট পাগল এ দেশের সবচেয়ে গৌরবগাথা এক অধ্যায়। সেদিন স্টিভ টিকোলো, মরিস ওদুম্বের কেনিয়াকে হারিয়ে স্বপ্নের বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করেছিল বাংলাদেশ। আইসিসি ট্রফির জয়ের পর ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আলাদাভাবে স্মরণ করে না দেশের ক্রিকেটের ভিত দেওয়া দিনটিকে।

১৯৭৯ সাল থেকে আইসিসি ট্রফি খেলছিল বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালে প্রথমবার আইসিসি ট্রফি খেলতে নামে ফেবারিট হয়ে। কিন্তু নবাগত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কেনিয়ার বিপক্ষে হেরে বিশ্বকাপে খেলা অধরাই রয়ে যায় বাংলাদেশের। দেশের ক্রিকেটার, ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশায়, বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন সেবার। কেননা, মহিন্দার অমরনাথের কোচিংয়ে যথেষ্ট ভালো প্রস্তুতি ছিল ফারুক বাহিনীর। সেবার না পারায় আইসিসির পরের আসরে বাড়তি মনোযোগ দেয় বিসিবি। কোচ নিয়োগ দেওয়া হয় ক্যারিবীয় লিজেন্ড গর্ডন গ্রিনিজকে। গ্রিনিজের কোচিংয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী করে আকরাম খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আকরামের অসাধারণ ৬৮ রানের অপরাজিত ইনিংসটিতে বাংলাদেশ সেমিফাইনাল খেলে। আকরামের ইনিংসটিকে বাংলাদেশের ‘ইনিংস অব দ্য হিস্টরি’ বলে। সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে ৭২ রানে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ নিশ্চিতের পর বাংলাদেশের লাখো-কোটি জনতা রাস্তায় নেমে আনন্দ, উচ্ছ্বাসে মেতেছিল। লোকে বলে, ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের পর এত আনন্দ আর কখনোই করেনি এ দেশের জনগণ।

ফাইনালে শক্তিশালী কেনিয়ার বিপক্ষে খেলে। নির্ধারিত ম্যাচ ছিল ১২ এপ্রিল। অথচ বৃষ্টিতে ফাইনাল দুই দিনে শেষ হয়। আইসিসির ইতিহাসে যা প্রথম। প্রথমদিন টিকোলোর ১৪৭ রানে ভর করে ৭ উইকেটে ২৪১ রান করেছিল কেনিয়া। আফ্রিকান দেশটির ব্যাটিংয়ের পর বাংলাদেশের মাঠে নামা হয়নি। ম্যাচ গড়ায় রিজার্ভ দিনে। চ্যাম্পিয়ন হতে বাংলাদেশের টার্গেট দাঁড়ায় ২৫ ওভারে ১৬৬ রান। ইনিংসের প্রথম ওভারেই উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে আকরাম বাহিনী। সেখান থেকে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে মোহাম্মদ রফিক ও মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ৫০ রান যোগ করেন। কিন্তু টাইগার ব্যাটারদের হাফ সেঞ্চুরির কোনো ইনিংস না থাকায় শেষ ওভারের সমীকরণ দাঁড়ায় ১১ রান। ৬ বলে ১১ রান। কঠিন সমীকরণ। উইকেটরক্ষক ব্যাটার খালেদ মাসুদ পাইলট ওভারের প্রথম বলে ছক্কা মারেন মার্টিন সুজিকে। ম্যাচ হেলে পড়ে বাংলাদেশের দিকে। ওভারের প্রথম ৫ বলের স্কোর ছিল ৬, ০, ওয়াইড, ১, ০, ২। জিততে শেষ বলে দরকার ১ রান। সুজির লেগ স্ট্যাম্পে বেরিয়ে যাওয়া বল হাসিবুল হোসেন শান্তের প্যাডে লাগার সঙ্গে সঙ্গে পাইলট প্রান্ত বদল করেন। রান নিশ্চিতের পরপরই ব্যাট উঁচিয়ে দৌড়াতে থাকেন শান্ত। পাইলট-শান্তের সেই বিজয়োল্লাস গোটা বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি হয়েছিল।

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে কিলাত ক্লাব মাঠের পুরোটা ল্যাপ অব অনার দেন আকরাম, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আতহার, পাইলট, দুর্জয়, শান্ত, সানোয়ার, খালেদ মাসুদ পাইলট, রফিক, জাহাঙ্গীররা। আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের শেরেবাংলা নগরে বিশাল এক গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলকে দেখতে লাখো লাকো মানুষের সমাগম ঘটেছিল সেখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights