খোলপেটুয়া নদীর ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত, এলাকায় স্বস্তি

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার খোলপেটুয়া নদীর ভেঙে যাওয়া বাঁধটি চার দিন পর জিও টিউবের মাধ্যমে রিংবাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে সক্ষম হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। শুক্রবার রিংবাঁধ দেওয়ার পরে লোকালয়ে নদীর জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে পাঁচ দিন আগে ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে ১১টি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়ে ২০ হাজার পরিবার। সকাল থেকে নদী ভাঙন এলাকা দিয়ে দুর্গত এলাকার পানি ভাটি নদীতে নামতে থাকে। তবে এখনও বসত বাড়ি-ওঠান আঙিনা, মাঠে-ঘাটে পানি জমে থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এখনও কৃষকের বোনা পাকা ধান ও মাছের ঘের তলিয়ে থাকায় সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন উপকূলবাসী।

গত ৩১ মার্চ সকালে ঈদের নামাজের পর সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর আওতাধীন ৭/২ পোল্ডারের আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছট এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর তীব্র জোয়ারের প্রবল স্রোতে দুইশত মিটার বেড়িবাঁধ নদী গর্ভে বিলিন হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে আনুলিয়া, বিছট, নয়াখালী, বল্লবপুর, বাসুদেবপুর, চেচুয়া, কাকবাসিয়া, পারবিছটসহ পার্শ্ববর্তী ১১ গ্রাম প্লাবিত হয়। ফলে পানিবন্দী হয়ে পড়ে প্রায় ২০ হাজার পরিবার। এতে উপকূলবাসীর ঈদ আনন্দ মলিন হয়ে যায়। এলাকাবাসী মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে স্বেচ্ছা শ্রমে বাঁধ নির্মাণে ঝাপিয়ে পড়ে। কিন্তু তীব্র জোয়ারে বাঁধটি সংস্কার করতে ব্যর্থ হয় তারা। ঘটনার দুই দিন পর বাঁধ মেরামতে নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তারা খোলপেটুয়া নদীতে বল গ্রেডারের মাধ্যমে জিও টিউবের মধ্যে পাইপ দিয়ে বালি ভরে বিকল্প একটি রিংবাঁধ তৈরি শুরু করে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মধ্যে কাজে অংশ নেন। এর ফলে পাঁচ দিনের মাথায় শুক্রবার দুপুরে ৩২০ মিটার রিংবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি আটকাতে সক্ষম হয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে দুপুর থেকে লোকালয়ে পানি প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্বস্তি ফেরে এলাকাবাসীর মধ্যে।

আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস জানান, খোলপেটুয়া নদীর বিছটের ২০০ মিটার ভেঙে যাওয়া বাঁধ দীর্ঘ পাঁচ দিনের মাথায় পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলাকাবাসী, আইনশঙ্খলা বাহিনী সহ সকলের প্রচেষ্টায় বিকল্প ভাবে জিওটিউবের মাধ্যমে ও রিংব্যাগ ফেলে রিংবাঁধটি শক্রবার দুপুর ১টার দিকে মেরামত করতে সক্ষম হয়েছে। এতে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।

তিনি আরও জানান, ৩১ মার্চ বাঁধ ভেঙে ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। ৬ হাজার বিঘা মৎস্য প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। আর কৃষকের ১২০০ বিঘা জমির পাকা ধান ও সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে তা নষ্ট হয়ে গেছে। এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকে বেড়িবাঁধের উপরে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তবে সকাল থেকে নদীর ভাঙন এলাকা দিয়ে দুর্গত এলাকার পানি ভাটি নদীতে তীব্র বেগে নামতে থাকে। দুপুরে রিংবাঁধটি সম্পন্ন হলেও এখনও বসত বাড়ির আঙিনা, মাঠে ঘাটে পানি জমে থাকায় জন দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এখনও কৃষকের বোনা পাকা ধান, বিভিন্ন শাক-সবজি ও মাছের ঘের তলিয়ে থাকায় সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন উপকূলবাসী।

এদিকে, এখন বসত বাড়িতে পানি থৈ থৈ করায় অনেকের বাড়ি ঘরে রান্না করতে না পেরে বেড়িবাঁধে অবস্থান নিয়েছে। বাঁধ ভাঙা দুযোর্গে এলাকায় তীব্র খাবার পানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাখায়াত হোসেন জানান, চারদিন প্রচেষ্টার পর অবশেষে ভাঙন কবলিত এলাকায় শুক্রবার দুপুরে ৩২০ মিটার এলাকাজুড়ে রিংবাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ আটকাতে সক্ষম হওয়া গেছে। এতে নদী ভাঙন দুর্যোগের হাত থেকে রেহায় পেয়েছে উপকূলবাসী। বাঁধের ওপরে সেকেন্ড লেয়ার ও থার্ড লেয়ারের কাজ শেষ হতে আর দু’দিন সময় লেগে যাবে। এরপর সেখানে মাটি ফেলার কাজ করে বাঁধটি স্থায়ী রূপ দেওয়া হবে। আর পরবর্তীতে দুর্গতদের সুরক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে কাজ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে হয়ত আরও দু’বছর সময় লাগতে পারে।

এদিকে, টেকসই বেড়িবাঁধের দাবিতে বেলা সাড়ে ১০টার সময় ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের উপর দাঁড়িয়ে কয়েক শতাধিক এলাকাবাসী দুর্নীতিমুক্ত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

এদিকে, মৎস্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, গত ৩১ মার্চ খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে জোয়ারের লোনা জলে ভেসে গেছে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ঘেরের মাছ। আর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আর ১০ কোটি। তবে এ অবস্থায় এলাকার জানমাল রক্ষায় খুব দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন উপকূলবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights