গলছে পারমাফ্রস্ট, নরওয়ের শহরে কলের পানি পানে নিষেধাজ্ঞা
অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি নরওয়ের প্রত্যন্ত শহর লংইয়ারবিয়েনের বাসিন্দাদের কলের পানি পান না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরফে জমাট মাটি গলে যাওয়ায় পানির উৎসে ভারী ধাতুর দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত লংইয়ারবিয়েনের প্রধান পানির উৎস ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা একটি হ্রদ। স্থানীয়ভাবে এটি ‘ইসডামেন’ নামে পরিচিত, যার অর্থ ‘বরফের পুকুর’।
জলবায়ু সংকটের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পারমাফ্রস্ট বা সারা বছর জমাট থাকা মাটি গলে যাচ্ছে। এতে উন্মুক্ত হয়ে পড়া শিলাস্তর থেকে বিভিন্ন ধাতু পানির উৎসে মিশছে।
উত্তর মেরু থেকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত শহরটিতে বিশ্বের গড়ের তুলনায় পাঁচ থেকে সাত গুণ দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ছে। শরৎকালে প্রতি দশকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে।
গবেষকদের মতে, শহরটির পানিতে ভারী ধাতুর দূষণের পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো পারমাফ্রস্টের গলন এবং দ্বিতীয়টি সাবেক খনিশহরটির ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য।
স্বালবার্ড ইউনিভার্সিটি সেন্টারের আর্কটিক ভূতত্ত্বের সহযোগী অধ্যাপক ও পারমাফ্রস্ট বিশেষজ্ঞ মারজোলাইন ভেরেট বলেন, ‘গলে যাওয়া পারমাফ্রস্ট ও পাইরাইট নামের খনিজসমৃদ্ধ শেল শিলার সংমিশ্রণে পানির উৎস দূষিত হচ্ছে।’
তিনি জানান, পাইরাইট বা ‘ফুলস গোল্ড’ নামের খনিজ পানি ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে জারিত হয়ে অম্লতা তৈরি করে। এর ফলে উৎপন্ন অ্যাসিড শিলা থেকে ভারী ধাতু বের করে জলপ্রবাহে মিশিয়ে দিতে পারে। লংইয়ারবিয়েনে মূলত ম্যাঙ্গানিজ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে শিলা থেকে অন্যান্য দূষকও পানিতে মিশতে পারে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে শহরটির প্রায় ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দাকে প্রথম সতর্ক করে পৌর কর্তৃপক্ষ লংইয়ারবিয়েন লোকালস্তিরে। তখন পানিতে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রামের প্রস্তাবিত সীমার চেয়ে ২৫ গুণ বেশি পাওয়া যায়। নরওয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পানিতে ম্যাঙ্গানিজের এই সীমা নির্ধারণ করেছে।
শহরটির মেয়র টের্জে আউনেভিক বলেন, পলি জমার কারণে সেখানকার পানির মান আগে থেকেই ভালো ছিল না। তবে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল’।
দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার ম্যাঙ্গানিজের সংস্পর্শে থাকলে স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও নবজাতকদের জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় একটি ব্রুয়ারির মাধ্যমে পরিশোধিত পানি সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। বাসিন্দারা স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকে পাত্রে করে বিনা মূল্যে ওই পানি সংগ্রহ করতে পারছেন। পাশাপাশি দূষণের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে পানিতে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা কমলেও চলতি বছরের শুরুর দিকে সালফেট ও নিকেলের মাত্রা পানীয় জলের জন্য সুপারিশকৃত সীমা ছাড়িয়ে যায়। ফলে কলের পানি পান না করার নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে।
আউনেভিক বলেন, ‘নরওয়েতে আমরা সব সময় ধরে নিয়েছি, কলের পানি সরাসরি পান করা যায়। এখন যেভাবে পানি বহন করে আনতে হচ্ছে, তা মেনে নেওয়া কঠিন। অন্যান্য ছোট জনবসতিরও সতর্ক হওয়া উচিত এবং নিজেদের পানির উৎসে এমন সমস্যা দেখা দিলে কী করা হবে, তা আগেভাগেই ভেবে রাখা প্রয়োজন।’
ভেরেটসহ অন্যান্য বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন, লংইয়ারবিয়েনের পানিদূষণ আর্কটিক অঞ্চলের অন্যান্য জনবসতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিরও পূর্বাভাস হতে পারে।
ভেরেট বলেন, ‘পাইরাইট ও ভারী ধাতুসমৃদ্ধ শিলা এবং গলে যাওয়া পারমাফ্রস্ট আর্কটিকের অন্যান্য এলাকাতেও রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে সুপেয় পানির উৎসকে প্রভাবিত করতে পারে, লংইয়ারবিয়েন তার প্রথম দিকের একটি উদাহরণ হতে পারে। উত্তর কানাডা ও আলাস্কাতেও এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।’
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
