চোখের সামনেই শিশুশ্রম

সাইফ ইমন

শৈশবে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল তার। অথচ মাত্র ১১ বছর বয়সেই মগবাজারের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে গভীর রাতেও কাজ করতে হচ্ছে অন্তু রুবেল মিয়াকে। নয় বছর বয়স থেকে ওয়েল্ডিং ও ধাতব সামগ্রী তৈরির কাজে যুক্ত সে। দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় এখন আগের মতো কানে শুনতে পায় না বলে জানিয়েছে শিশুটি। বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মা ও ছোট বোনের সঙ্গে মগবাজারের পেয়ারাবাগ বস্তিতে থাকে সে। পরিবারের আর্থিক সংকটে শৈশবের স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়েছে রুবেল মিয়ার মতো অসংখ্য শিশু।

রাজধানীর মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইখাল, তেজগাঁও, মগবাজার, কারওয়ান বাজার ও বাংলা মোটরের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকানপাট এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট কাজে দেখা মেলে এমন শিশুদের। কেউ গাড়ি মেরামতের কাজ করছে, কেউ ভারী যন্ত্রপাতি বহন করছে, কেউ খাবারের দোকানে পরিবেশন করছে, আবার কেউ ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকের আসনে বসছে। দিনের কর্মব্যস্ততা পেরিয়ে রাত গভীর হলেও অনেকের কাজ শেষ হয় না। তাদের শ্রম দৃশ্যমান হলেও নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি কর্মে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার। এর মধ্যে শিশুশ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১৭ লাখ ৭৬ হাজার শিশু। আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৬৮ হাজার শিশু। অর্থাৎ, শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের বড় একটি অংশই এমন কাজে যুক্ত, যা তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

শিশুশ্রমের এই চিত্র শুধু কারখানা বা ওয়ার্কশপেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জীবিকার তাগিদে শিশুদের যুক্ত হতে হচ্ছে নানা ধরনের কাজে। কোথাও তারা দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রপাতির সঙ্গে কাজ করছে, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে যানবাহন চালাচ্ছে, আবার কোথাও রাত পর্যন্ত হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ করছে। এসব শিশুর অনেকেরই নেই নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম কিংবা কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তারের মতে, শিশুশ্রম বন্ধে পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। পরিবারে উপার্জনের সুযোগ তৈরি করা গেলে শিশুদের কাজে পাঠানোর চাপ কমতে পারে। তাঁর মতে, শিশুশ্রম নির্মূলে হঠাৎ কোনো পদক্ষেপের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। শিশুশ্রমের পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। কড়াইল বস্তিতে জাগো ফাউন্ডেশন স্কুলের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেক শিক্ষার্থী স্কুলের পর কাজে বেড়িয়ে পড়ে। এতে তাদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হয়। একসময় ঝড়ে যায় স্কুল থেকে। এভাবে প্রতি বছর অনেক শিশু ঝড়ে যাচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা থেকে। ২০১৩ সালের জাতীয় জরিপে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার। ২০২২ সালের জরিপে তা কমে প্রায় ১০ লাখ ৬৮ হাজারে দাঁড়ায়। তবে একই সময়ে দেশে কর্মে নিয়োজিত শিশুর সামগ্রিক সংখ্যা বেড়েছে। ফলে ঝুঁঁকিপূর্ণ কাজে কিছুটা অগ্রগতি হলেও শিশুশ্রমের সামগ্রিক সমস্যা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বিবিএসের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের বাস্তবতা উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে সরকার ঘোষিত ঝুঁঁকিপূর্ণ খাতের মধ্যে পাঁচটি খাতের ওপর চালানো জরিপে ৪০ হাজার ৫২৫টি প্রতিষ্ঠানে ৩৮ হাজার ৮ জন কর্মরত শিশু শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ করছিল ২৪ হাজার ৯২৩ শিশু। এ ছাড়া চামড়ার জুতা তৈরি, ওয়েল্ডিং, গ্যাস বার্নার মেরামত এবং স্থানীয় দর্জি ও পোশাক তৈরির কাজেও শিশুদের পাওয়া যায়। ধোলাইখাল ও মগবাজারের মতো এলাকায় ওয়ার্কশপে শিশুদের কাজের ধরন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব কাজে ভারী যন্ত্রাংশ বহন, ধাতু কাটা, ওয়েল্ডিং এবং শব্দ ও ধোঁয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়। বয়সের তুলনায় কঠিন এসব কাজ শিশুদের শারীরিক বিকাশ ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। রুবেল মিয়ার অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights