জমজমাট নতুন নোটের অবৈধ বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঈদ এলেই নতুন নোটের চাহিদা বেড়ে যায়। নতুন নোট পণ্য হিসেবে বিক্রি বেআইনি হলেও রাজধানীতে প্রকাশ্যেই চলছে এই বেচাকেনা। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশেই এবং গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের সামনের ফুটপাতে নতুন নোটের অবৈধ বাজার জমে উঠেছে। এ ছাড়াও বিক্রি হচ্ছে শাঁখারি বাজার মোড়ে- এসব এলাকা মিলিয়ে শতাধিক অস্থায়ী দোকানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকা কেনাবেচা করতে দেখা গেছে। বিক্রেতাদের কাছে দুই টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত নতুন নোটের বান্ডিল পাওয়া যাচ্ছে। তবে এসব বান্ডিল কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন নোট ছাড়েনি বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ নতুন নোট সংগ্রহ করতে পারবেন। ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে গিয়েও নতুন নোট পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা।

চার-পাঁচ দিন ধরে বেড়েছে চাহিদা : নতুন নোটের ব্যবসায়ীরা জানান, গত চার-পাঁচ দিন ধরে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। এবার ঈদের আগে ছুটি শুরু হওয়ায় মানুষ আগেভাগেই নতুন নোট সংগ্রহ করতে আসছেন। গত রবিবার সকালে মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাতের ওপর বা অস্থায়ী টেবিলে সাজিয়ে নতুন নোট বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। বিক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার কিছু নোটের দাম কিছুটা কম।

কোন নোটের চাহিদা বেশি : বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ৫, ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের। পাশাপাশি ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নতুন নকশার নোটও বিক্রি হচ্ছে। নতুন নকশার নোটের জন্য ক্রেতাদের অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে পুরোনো নকশার ২ টাকার নতুন এক বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বাড়তি দামে। ১০ টাকার পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে। নতুন নকশার ১০ টাকার নোট কিনতে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এ ছাড়া ২০ টাকার নতুন নকশার নোটের বান্ডিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং পুরোনো নকশার নোট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ টাকার পুরোনো নকশার নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা বাড়তি দামে এবং নতুন নকশার নোটের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ১০০ টাকার নতুন ও পুরোনো নোটের বান্ডিল বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়তি দামে। এ ছাড়া ২০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটের বান্ডিল কিনতেও ক্রেতাদের দিতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা অতিরিক্ত। তবে বিক্রেতা ভেদে দামে কিছুটা কমবেশি রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দরদাম করে বান্ডিলপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা কমাতেও দেখা গেছে।

ব্যাংকে না পেয়ে ফুটপাতে : মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে নতুন নোট কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ২০ টাকার এক বান্ডিল নতুন নোট কিনতে ৩৩০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ফরিদপুর যাব। বাড়ির ছোট ভাই ও শিশুদের জন্য নতুন নোট নিতে চেয়েছিলাম। সকালে ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত এখানে এসে কিনতে হলো।’ গুলিস্তানে নতুন নোট কিনতে আসা রেজাউল করিম বলেন, ‘গ্রামে যাওয়ার আগে তারা ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের বান্ডিল কিনতে এসেছেন। তাদের কাছে বান্ডিলপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম চাওয়া হয়েছে।’

দাম আরও বাড়তে পারে : গুলিস্তানের এক বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে এবার নতুন নোটের সরবরাহ কম। বর্তমানে দাম কিছুটা কম থাকলেও ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, চাহিদা বাড়লে দাম আরও বাড়তে পারে।

নতুন নোট বিক্রি বেআইনি : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন নোটকে পণ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা যদি এ ধরনের কাজে জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, প্রতিটি উৎসবে নতুন নোটের চাহিদা থাকলেও ধীরে ধীরে এই আকাঙ্ক্ষা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, কারণ দেশ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। নতুন নোট কোনো পণ্য নয়, তাই এটি বিক্রি করাও বেআইনি। তিনি জানান, এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে এবং ব্যাংকিং খাতের কেউ যুক্ত থাকলে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights