টানা ৯৪ দিন অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি, চরম সংকটে নৌ-বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক নৌপথটি টানা ৯৪ দিন ধরে কার্যত অচল হয়ে রয়েছে।

অ্যাথেন্সে আয়োজিত বার্ষিক আন্তর্জাতিক শিপিং প্রদর্শনীতে সমবেত হওয়া বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নৌ-বাণিজ্য নির্বাহীরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি এবং নিরাপদ যাতায়াতের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা এই ২১ মাইলের ঝুঁকিপূর্ণ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজ পাঠাতে রাজি নন। এই দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, যার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং সার সরবরাহও। গত সপ্তাহে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার আশায় তেলের দাম কিছুটা কমলেও, সপ্তাহান্তে ওই অঞ্চলে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়া এবং ইরানের শান্তি আলোচনা থেকে সরে আসার খবরে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বেড়েছে।

গবেষণা সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত, সেখানে গত শুক্রবার মাত্র ৭টি জাহাজ এবং সপ্তাহান্তে মাত্র ৪টি জাহাজ এই পথ পার হতে পেরেছে।

কেপলারের কমোডিটি রিসার্চ ডিরেক্টর ম্যাট স্মিথ জানিয়েছেন, প্রতিদিন হাতেগোনা কয়েকটি ট্যাংকার পার হওয়া ছাড়া প্রণালিটি মূলত বন্ধই রয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস বন্দরের নির্বাহী পরিচালক জিন সেরোকা জানিয়েছেন, দু-একটি জাহাজের সফল পারাপার বিশ্ববাজারে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আসল বিষয় হলো, জাহাজ পরিচালনাকারী এবং বিমা কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ব্যাপারে কতটা আশ্বস্ত হতে পারছে। গত মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সহায়তায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ উদ্যোগটিও স্বল্পস্থায়ী প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন বাহিনী বর্তমানে কোনো জাহাজকে এসকর্ট বা পাহারা দিচ্ছে না, তবে তারা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখছে।

সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এরই মধ্যে সোমবার পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে একটি মালবাহী জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর মেরিটাইম সিকিউরিটি সংস্থা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)-এর হিসাব মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই অঞ্চলে এ পর্যন্ত ৩৯টি জাহাজে হামলা হয়েছে এবং ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রণালি বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য সরবরাহকারী কনটেইনার জাহাজগুলোও আটকা পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপিং প্রতিষ্ঠান ‘মার্স্ক’-এর কোনো জাহাজ মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই এলাকা ছাড়তে পারেনি এবং তাদের ৬টি জাহাজ এখনো উপসাগরে আটকা পড়ে আছে। অ্যাথেন্সের সম্মেলনে আইএমও-এর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গোজ নাবিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং যেকোনো ধরনের বৈষম্যমূলক ট্রানজিট ফি বা শুল্ক আরোপের বিরোধিতা করেছেন।

হরমুজ প্রণালির এই সংকটের কারণে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের নৌ-পরিবহন ভাড়াও আকাশচুম্বী হয়েছে। গ্রিক ট্যাংকার অপারেটর ‘হাইডমার’ জানিয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে ভাড়া বৃদ্ধির কারণে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাদের আয় গত বছরের তুলনায় ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

শেভরনের প্রধান নির্বাহী মাইক ওয়ার্থ ব্লুমবার্গকে বলেছেন, যুদ্ধের ফলে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর হবে না। মাসের পর মাস ধরে আটকে থাকা ক্রুদের আবার সেখানে পাঠাতে জাহাজের মালিকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। একইসঙ্গে তেলক্ষেত্রগুলো পুনরায় সচল করা এবং ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করার প্রক্রিয়াটি মোটেও রাতারাতি সম্পন্ন হওয়ার মতো নয়। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির এই দীর্ঘস্থায়ী পক্ষাঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights